বাগেরহাটের পান চাষিদের মাথায় হাত !

Pan-Boraj-Pic-01‘নারকেল, পান, সুপারির হাট’- এই নিয়ে বাগেরহাট। ঐতিহ্যের মতো করেই বাগেরহাটের নামের সাথে মিশে আছে ‘পান’ শব্দটি।

অনুকুল আবহাওয়া, মাটি, পানি ও জলবাযুর কারনে বহু আগে থেকেই এ অঞ্চলের পান চাষ শুরু হয়। তাই তো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের এ জেলার নামের সাথে প্রবাদের মতোই শোনা যায় পানের নাম।

বরাবরই পান চাষে সমৃদ্ধ বাগেরহাট। দেশ জুড়ে বাগেরহাটের পানের আলাদা কদরও আছে। তাই জেলার প্রায় সব এলাকাই প্রচুর প্ররিমানের পানের চাষ হয়।

প্রতি বছরের মতোন এবারও বাগেরহাটের চাষিরা সহস্রাধিক হেক্টর জমিতে অর্থকরী ফসল হিসাবে পানের চাষ করেন। কিন্তু এবার টানা বর্ষণে বাগেরহাটের অন্যতম অর্থকারী ফসল পান চাষে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

শুধু মাত্র বাগেরহাট সদর উপজেলার সহস্রাধিক পানের বরজ নষ্ট হয়ে এরই মধ্যে।

জানা গেছে, ভারি বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় উপড়ে গেছে জেলার অধিকাংশ পানের রবজ। পান ও বরজের গাছ নষ্ট হওয়াতে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন অনেক চাষি।

Bagerhat-Photo-1Pan-Boraj-damageহটাৎ করে পান চাষে এমন বিপর্যয় সারাদেশে পানের সরবরাহ ও বাজারের উপর ফেলবে বলে ধরণা করছেন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়িরা।

পান চাষে সমৃদ্ধ জেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে এবং পান চাষি ও ব্যবসায়িদের সাথে কথা বলে এ উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠার কথা জানা গেছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বাগেরহাট সদরের যাত্রপুর, কাড়াপাড়া, বারুইপাড়া, বিষ্ণুপুর, সিংড়াই, পাটরপাড়া, ষাটগুম্বুজ, দেয়ালবাটি ছাড়াও জেলার ফকিরহাট, কচুয়া, চিতলমারী উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের পান চাষিরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।

সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পানের বরজ পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। নষ্ট হয়েছে জমির ফসল।সহস্রাধিক পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হওয়াতে এসব এলাকার পান চাষিরা অসহায় জীবন-যাপন করছেন।

বাগেরহাট সদর উপজেলার সিংড়াই গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ পান চাষি মমতাজ বেগম (৪০) বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে বলেন, একটু পানের বরজ ছিল, তাই দিয়ে আমাগো সংসার চলত। তাও শেষ হয়ে গেছে এই বর্ষায়। এখন কোথায় যাব ? কিভাবে চলব ? কিছুই জানি না।

একমাত্র আয়ের উৎস ২৬ শতকের বরজটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছি। এখন এনজিও’র লোন কিভাবে পরিশেধ করব?

বাগেরহাট সদরের যাত্রপুর এলাকার পানের পাইকারী ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে জানান, টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতা ও পানি উঠে তাদের এলাকার অসংখ্য পানের বরজ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক পানের বরজ মাটির সাথে মিশে গেছে। বৃষ্টির পানি এখনো অপসারণ করতে না পারায় মরে যাচ্ছে নতুন নতুন বরাজের পান গাছ।

পান চাষিদের অভিযোগ, নদী ও খালের নাব্যতা হ্রাসের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে খাল দখল করে মাছ চাষ করছে। এদের কারণে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বরজগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সমস্যার সমাধানে স্লুইজগেট গুলো সচল করা, আরো গেট নির্মাণ, খাল খনন ও দখল মুক্ত করে পানি নিষ্কাশনের দাবি ভুক্তভোগীদের।

ষাটগুম্বুজ ইউনিয়নের কবির শেখ জানান, এনজিও থেকে টাকা উঠিয়ে (লোন) এবার পানের বরজ করেছিলাম। পানও খুব ভালো হয়েছিল। কিন্তু রোজার শুরু থেকে টানা বর্ষণে বরজে পানি উঠে গাছসহ সব পান নষ্ট হয়ে গেছে।

Pan-Boraj-Pic-02বাগেরহাটের কাড়াপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখ বশিরুল ইসলাম বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে জানান, তার এলাকার ৩৫/৩ পোল্ডারের জিপতলা খালে ওয়াপদার ছোট একটি গেট রয়েছে। ওই গেটটি দিয়েই ৮/১০টি গ্রামের বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি নিষ্কাশন হতে পারে না।

আর এ কারণে কাড়াপাড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার পানি নামতে না পারায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় পানের বরজসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

বাগেরহাটের অন্যতম প্রধান এই অর্থকারী ফসলের বিপর্যয় ঠেকাতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পান চাষে আগ্রহ হাবাবে চাষিরা ।

বাগেরহাট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহাদেব চন্দ্র সানা বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে জানান, চলতি বছর সদর উপজেলার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ১১৩ হেক্টর জমির পানের বরাজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্থ ৮৫০ জন পান চাষির তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। জলাবদ্ধা কমার সাথে সাথে ক্ষতি গ্রস্থ অন্য চাষিদের তালিকা তৈরি করা হবে।

টাকার অঙ্কে এবার জেলার পান চাষিদের ক্ষতির পরিমান কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়িরা।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ী) ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বাংলানিউজকে জানান, এবার জেলার পানা চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্থ চাষিদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. জাহাংগীর আলম বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে বলেন, কৃষি বিভাগ আমাদেরকে অবহিত করেছে যে, ক্ষতির পরিমান ও ক্ষতিগ্রস্থ পান চাষিদের সংখ্যা জানতে তাদের জরিপের কাজ চলছে। প্রাথমিক হিসাবে শতাধিক হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে তথ্য পাঠিয়েছে।

প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের নাম ঠিকানাসহ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। এটা পাওয়া মাত্রই আমরা সরকারকে অবহিত করব।

০৬ আগস্ট :: সরদার ইনজামামুল হক,
বাগেরহাট ইনফো ডটকম।।
এস/আইএইচ/এনআরএ/বিআই
বাগেরহাট ইনফো নিউজWriter: বাগেরহাট ইনফো নিউজ (1300 Posts)