আইন করে হয় কি ভালবাসা?

আশা নাজনীন
আইন করে কি ভালবাসা হয়? আইন করে কি শ্রদ্ধা বাড়ানো যায়? যে ছেলে তার বাবা-মাকে ভালবাসে, সে যত কষ্টেই থাকুক, তাদের ফেলে দেয় না। স্ত্রী না চাইলেও সে গোপনে বাবা-মাকে হাত খরচ দেয়। যে মেয়ে তার বাবা-মাকে ভালবাসে, সে স্বামী না চাইলেও লুকিয়ে তাদের সাহায্য করে। এবং এই ভালোবাসাই আমাদের দেশের সম্পদ। আমাদের অহংকার। এই সম্পদের পরিমাণ কি এতোই কমে এসেছে যে আইন করে বাবা-মা’র ভরণ পোষণ বাধ্যতামূলক করতে হচ্ছে?
নিশ্চয়ই কমে এসেছে। নইলে এমন আইন হলো কেন?
ধরি, সন্তানের আয় ২০ হাজার টাকা। আইন অনুসারে মাস শেষে বৃদ্ধ বাবা-মাকে দুই হাজার টাকা ধরিয়ে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ? এমন অনেক ছেলে আছে যে ২০ হাজার টাকা বেতন থেকে মাস শেষে বাবা-মাকে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেন। এখন আইন অনুসারে সে কি টাকার পরিমাণ কমিয়ে দেবে? এই আইনে বরং পরোক্ষভাবে একক পরিবারকে উত্সাহিত করা হয়েছে। মানবিক দায়িত্বকে পদদলিত করে অধিকাংশ স্ত্রী এখন তার স্বামীকে বলবে-‘আইন অনুযায়ী তাদের মাস শেষে টাকা দিয়ে দাও, আলাদা সংসার চাই।’ সন্তানের আয়ের ১০ ভাগ দিয়ে এইসব বাবা-মায়ের বৃধ্যাশ্রমে থাকার টাকাটাও যে হবে না!
সমস্যার মূলে না যেয়ে, আগাছা কাটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ না। সব সংসারেই টুকটাক মনোমালিন্য, এর সঙ্গে ওর ভুল বোঝাবুঝি আছে। বৌয়ের সঙ্গে শাশুড়ির সম্পর্কের টানপোড়েন আছে-কম আর বেশি। এগুলো থাকবেই। এর কারণেই এর নাম সংসার। কিন্তু তাই বলে স্ত্রী যদি স্বামীকে প্রভাবিত করে শশুর-শাশুড়িকে দেখভাল না করার জন্য, এর সমাধান আইন দিয়ে হবে না। ঘরে ঘরে মাথা নষ্ট করা হিন্দি সিরিয়াল দেখা বন্ধ করতে হবে। স্কুল কলেজের বইতে পারিবারিক নীতি, আদর্শ, শ্রদ্ধা, দায়িত্ত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অধিকাংশ মেয়ে শশুর বাড়িকে নিজের বাড়ি ভাবতে পারে না, একটা ভীতি নিয়ে সে বড় হয়। এই ভীতি দূর করে শ্রদ্ধার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য থাকলে সন্তান মাদকাসক্ত হওয়া বা বিপথে যাবার আশংকা কমে আসবে ৯০ ভাগ। অতএব, স্বামীর টাকার উপরে রাজনীতি বন্ধ করে কিভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজে কর্মক্ষম হতে পারবে, সেই দৃষ্টিভঙ্গী শেখানো উচিত। শশুর-শাশুড়ির কাছে নিজের সন্তান যতটা নিরাপদ, শুধু কাজের লোকের কাছে ঠিক ততটা অনিরাপদ! এইগুলো বুঝতে হবে।
আবার যারা বৃদ্ধ, তাদেরও আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যনেলের মাধ্যমে সচেতন করতে হবে। শাশুড়িরা (বেশিরভাগ) নতুন বউ ঘরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পেছনে লেগে সম্পর্কটা শুরুতেই তিতে করে ফেলবেন না। মনে রাখবেন, ছেলের বৌয়ের পিছে লাগা মানে কার্যত ছেলের পিছনে লাগা। সংসারে শান্তির জন্য ছেলে দুরে সরে যেতে চাইবে। ইট মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। বৌকে ইট না মেরে ফুল দিন। ফুল দিতে না চাইলে মুখ এবং চোখ বন্ধ রাখুন। বউ দেখতে ভালো না কেন-এই চিন্তা বাদ দিন। বউ দেখতে এত সুন্দর কেন-এই চিন্তাও বাদ দিন। নাতি-নাতনিদের কাছে ওদের মায়ের বদনাম করবেন না। জিভ ছোট রাখুন। দোষ করলে নিজের সন্তান ভেবে মাফ করে দিন, বুঝিয়ে বলুন। ছেলে আর ছেলের বৌয়ের সম্পর্কের মধ্যে অযথা নাক গলাবেন না। ভালবাসুন, ভালোবেসে একটা মায়ার সম্পর্ক গড়ুন। ছেলের সংসারে যখন থাকবেন, মনে করবেন আপনি মেয়ের সংসারে আছেন। জামাইয়ের কাছে যেমন নিজের মেয়ের প্রশংসার ফুলঝুরি তোলেন, ছেলের কাছে বৌয়ের বেলায় তার ব্যতিক্রম করবেন না। দেখবেন, আপনি রানীর আসনে আছেন।
পুনশ্চ
দেশে পিতামাতার ভরণ পোষণের জন্য আইন পাস করা হয়েছে। কোনো সন্তান পিতামাতার ভরণপোষনের ব্যবস্থা না করলে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেলের বিধান করে সংসদে একটি বেসরকারি বিল পাস হয়েছে। বিল অনুযায়ী পিতামাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে তাদেরকে সন্তানের আয়ের ১০ ভাগ দিতে হবে।
Asha-Najninলেখক : আশা নাজনীন
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।
গত অমর একুশে বইমেলার আলোচিত উপন্যাস ‘শাশুড়িপুরাণ’-এর লেখক।
Writer: Bagerhat Info Blog (51 Posts)