জিম্মিদের বোবা কান্নায় ভারি সুন্দরবনের নোনা পরিবেশ

Doshu-in-SundorBon-05বিশ্বের সর্ববৃহৎ ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ সুন্দরবন। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ বনের ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটারেরই মালিকানা বাংলাদেশের। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রক্ষাকবচ এই বনকে ঘিরে জীবন ও জীবীকা প্রায় ৭ লাখ পরিবারের। কিন্তু জলদস্যু ও বনদস্যুর হাতে জিম্মি এই মানুষগুলো। গোটা ত্রিরিশেক ছোট-বড় দস্যুবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের ভয়ে সন্ত্রস্ত বনজীবীরা। র‌্যাব পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে পরে কোনো কোনো বাহিনীর প্রধান মারা পড়ে। ভেঙ্গে যায় সে বাহিনী কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। আবার গড়ে ওঠে নতুন বাহিনী। শুরু হয় নতুন নতুন নামে নতুন সন্ত্রাস!!
আর এসব দস্যু বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না এই বনের প্রধান আর্কষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ এমন কি কুমিরও। টান দুই সপ্তাহের অভিযানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ ঘুরে এসে এসব বিষয়ে রিপোর্ট তৈরী করেছেন আমাদের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট রহমান মাসুদ। আজ ৭ম পর্ব।
Zimmi-Dar-Cunnaবাড়িতে মেয়ের বিয়ে ঠিক। বিয়ের টাকা জোগাড়ের জন্য আব্দুল লতিফ গাজী প্রতিবেশি অন্য ছয়জনের সঙ্গে সুন্দরবনে আসেন মৌয়ালের কাজে।

আসার সময় পুঁজি হিসেবে মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নেন ৪০ হাজার টাকা। শর্ত ছিল, মধু নিয়ে বাড়ি ফিরে টাকার সঙ্গে আরো ৪০ কেজি মধু লাভ হিসেবে দেবেন মহাজনকে।

কিন্তু ২৭ দিন পর বাড়ি যাওয়ার পথে রাজু বাহিনীর হাতে বন্দি হয় তাদের নৌকা। ২৭ দিনের অর্জিত সব মধুই রেখে দিল ডাকাত দলটি। পূঁজিসহ ২৭ দিনের সকল অর্জন হারিয়ে জঙ্গলেই আর্তনাদ করছেন লতিফ গাজী। কিন্তু ভয়ে সেই আর্তনাদ রূপ নেয় বোবা কান্নায়।

জিম্মিদের এ বোবা কান্নায় মাঝে মাঝেই ভারি হয়ে ওঠে সুন্দরবনের নোনা পরিবেশ।

রাজু বাহিনীর হাতে জিম্মি আব্দুল লতিফদের সঙ্গে কথা হয় রাজু বাহিনীর জিম্মিখানায়। তিনি জানান তাদের অপরিসীম কষ্টের কথা।

২৭ দিন আগে খুলনার কয়রা উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মধু কাটতে বনে আসেন আব্দুল লতিফ গাজী। তার সঙ্গে ছিলেন একই গ্রামের ইসহাক, মান্দার মোল্যাসহ আরো তিনজন।

বনে প্রবেশের পাস জোগাড় করতেই তাদের পড়তে হয় দালালের খপ্পরে। সাধারণ ফি’র সঙ্গে অতিরিক্ত যোগ করে জনপ্রতি মৌয়ালদের খরচ হয় ১ হাজার টাকা করে।

বন বিভাগের পাস জোগাড়ের পরই তারা নির্বিঘ্নে মধু কাটতে যোগাযোগ করেন রাজু বাহিনীর দুই সদস্য পাশের দাশবাড়িয়া গ্রামের আসাদ ও ভোলা নূর ইসলামের সঙ্গে। মাথাপিছু দুই হাজার টাকায় ডাকাতদের সঙ্গে দফা-রফাও হয় তাদের। কিন্তু বনে প্রবেশের সময় ভোলার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে ব্যার্থ হন লতিফ গাজীরা।

এ অবস্থায় বাড়িতে ১৫ কেজি করে চাল কিনে দিয়েই বাকি টাকার বাজার সদাই নিয়ে বদর বদর করে বনবিবি-গাজী কালুর বন্দনা আর নোয়াপাড়ার পীর সাহেবের পড়া লাল রুমালটি আড়াই হাজার টাকার ভাড়ার নৌকার ছৈয়ে গুঁজে দিয়ে নৌকা ভাসান তারা।

চলতি পথে বড় কুকুমারী খালের কাছে আসতেই রাজু বাহিনীর মুখে পড়ে দলটি। মৌয়াল দলটিকে ধরে নিয়ে যায় ডাকাতরা। পরে নগদ সাড়ে ছয় হাজার টাকা রেখে দলটিকে ছেড়ে দিলেও দলের সদস্য ইসহাক মোল্যাকে দুই দিন আটকে রাখেন ডাকাতরা।

Doshu-in-SundorBon-10দুই দিন পর ভোলা নূর ইসলাম বাকি ৭ হাজার টাকার জামিনদার হলে ইসহাককেও ছেড়ে দেন তারা। বাকি ২৫ দিনে শিপসা নদীর পূর্ব পাশের বনে ১৩ ড্রাম মধু সংগ্রহ করেন আব্দুল লতিফ গাজীরা। প্রতিটি ড্রামে ৪৪ কেজি করে মোট ৫৭২ কেজি মধু আয় হয় তাদের। মণপ্রতি ৯ হাজার ৮০০ টাকা হিসেবে মোট মধুর দাম দাঁড়ায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বেশি। মহাজনের দেনা শোধ করে বাড়তি টাকায় মেয়ের বিয়ের খরচসহ সংসারের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখেন লতিফ গাজী ও তার সঙ্গীরা।

এ স্বপ্নে বিভোর হয়েই একটি ছোট ভুল করে বসেন তারা। দিনের আলোয় রওনা না দিয়ে শিগগিরই বাড়ি যাওয়ার তাড়ায় শিপশা নদীর তীর ধরে রাতের জোয়ারেই বাড়ির পথে নৌকা ভাসান মৌয়ালরা। যন্ত্রের যুগে দাড় বাওয়া নৌকাটি এক সময় রাজু বাহিনীর সামনে এসেই পড়ে। এরপরই নৌকাটি ধরে এক ছোট খালের মধ্যে নিয়ে যান ডাকাতরা।

এক দিন পর সব মধু রেখে দিয়ে লতিফ গাজীদের ছেড়ে দেয় রাজু বাহিনী। এভাবেই শেষ হয় একটি মর্মান্তিক গল্পের।

কথা হয় লতিফ গাজীর সঙ্গে। অন্য ৩৫ জন জিম্মির সঙ্গে ছিলেন তারা সাতজনও। ডাকাত বাহিনীর কড়া নজরদারির ফাঁকে তিনি জানালেন তার আর্তনাদের কথা।

বাড়িতে তার ৪ ছেলে ও ১ মেয়েসহ ৭ জনের সংসার। বনে মধু ভাঙ্গা, কাঁকড়া ও পোনা ধরে চলে সংসার। বনের আয়ে কোনো রকমে সংসার চললেও মেয়ের বিয়ে ঠিক হওয়ায় অথৈ সাগরে পড়েন তিনি। বিয়ের টাকা যোগাড় করতেই এবার মধু সংগ্রহ করতে ৬ প্রতিবেশিকে নিয়ে বাঁদায় আসা। কিন্তু সব হারিয়ে মহাজনের দেনা ঘাড়ে নিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হবে ভেবেই চোখ ভাসাচ্ছেন তিনি।

একই অবস্থা এই দলের বাকি সব সদস্যের। গফুর গাজীর ও বাড়িতে আছে দুই মেয়ে এক ছেলে। মেয়ে দুইটি এখনই বিয়ের উপযুক্ত। ইসহাক মোল্যার এক মেয়ের বিয়ে হলেও আর একটির বিয়ের কথা হচ্ছে পাশের গ্রামের এক ছেলের সঙ্গে। ছেলেটি বড় হলেও কোনো কাজই করেন না তিনি। মান্দার মোল্যার তিন ছেলে দিনমজুরির কাজ করলেও বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন না তারা। তাই বাধ্য হয়েই পেটের দায়ে বাঁদায় এসেছে ৭০ বছরের এই বৃদ্ধ।

বাড়ি ফিরেই এ মৌয়াল দলটিকে মুখোমুখি হতে হবে মহাজনের। ৪০ হাজার টাকার সঙ্গে আরো ১০ হাজার টাকা দিতে হবে সুদ। এ টাকার সংস্থানই এখন তাদের কাছে মরণ যন্ত্রনা হয়ে দেখা দিয়েছে।

সুন্দরবনে আসা বনজীবীরা এভাবেই প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছেন। তাদের দেখভালের দায় যে বন বিভাগ এবং কোস্টগার্ডের হাতে তাদের সঙ্গে ডাকাতদের সখ্যতার অভিযোগ রয়েছে সব জায়গায়।

০৮ জুলাই ২০১৪ :: রহমান মাসুদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট,
সূত্র – বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ছবি- রহমান মাসুদ।

ছবি- রহমান মাসুদ।

রহমান মাসুদ
সুন্দরবন থেকে ফিরে: দুই সপ্তাহের সুন্দরবন ভ্রমন। পুরোটাই নৌকা জীবন। মাঝে ২ রাত হোটেলে এসি ছেড়ে ঘুম। বাকি সময় নৌকার তক্তায় খোলা আকাশের নীচে। রোদ- পূর্ণিমার আলো ভরা জোয়ার, শুকনো ভাটা গহীন জঙ্গলের মধ্যে। ছোট্ট নৌকায় রান্না খাওয়া। এতো ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছি লিখতে কষ্ট হচ্ছিল।
ডাকাত খুজতে গিয়ে গুলির মুখোমুখি আবার তিনদিন ডাকাতের আতিথিয়েতা। জিম্মীদের আর লুন্ঠিতদের বোবাকান্নার দীর্ঘশ্বাস। দস্যুতার পেছনের গল্প।
পাখি পুলিশের যুদ্ধ যেমন দেখেছি, তেমনি মরা কুমির আর হরিণ শিকারের দৃশ্য ও দেখেছি। মাছ ধরতে গিয়ে সাপ ধরা আর ঝাকি জালের নিচে কুমির, তারপর মৌমাছির কামড়, নৌকায় গাছ থেকে গুঁইসাপের লম্ফ। কোনটা রেখে কোনটা যে বলি! বলে রাখি সুন্দরবন মানে কিন্তু কেবল করমজল, কটকা, হিরণ পয়েন্ট না। কেবল বাংলাদেশেই সুন্দরবন ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার…

সুন্দরবনের দস্যু নামা !
দস্যুরা মুক্তিপণ নেয় মোবাইল ব্যাংকিং এ
অপহরণ বানিজ্যে বন্দী বনজীবী
সুন্দরবনে প্রশাসনের সহায়তায় দস্যুতা!
দস্যু বাহিনীর সন্ধানে সুন্দরবন 
ডাকাতি নয়, ব্যবসা- দাবী দস্যুদের

ইনফো ডেস্কWriter: ইনফো ডেস্ক (1855 Posts)