সুন্দরবনে সাড়ে তিন বছরে ৬১ বনদস্যু নিহত, তবুও অপতিরোধ্য দস্যুরা

ইনজামামুল হক ::

বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে সুন্দরবনের বনদস্যু নিহত হলেও দমছে না দস্যু বাহিনী তৎপরতা। এখনও অপতিরোধ্য বনদস্যু বাহিনী। নতুন নতুন বাহিনী গঠন করে আবারও তারা সুন্দরবনে শুরু করে দস্যুতা।

SundorBon_imajeএক হিসাবে দেখা যায় গত সাড়ে তিন বছরে সুন্দরবনে যুদ্ধ ও গনপিটুনিতে ১২ বাহিনী প্রধানসহ ৬১ বনদস্যু নিহত হলেও বন্দ হয়নি তাদের কর্মকান্ড।

এক জনের মৃত্যু হলে নতুন করে আরেক জনের আবির্ভাব হচ্ছে। শুরু হচ্ছে পুনরায় তাদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। এ অবস্থায় জেলেসহ বনজীবীরা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করে বিকল্প কাজের সন্ধান করছেন।

র‌্যাপিড একশান ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব-৮) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফরিদুল আলম জানান, ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের ১০ আগষ্ট পর্যন্ত র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা সুন্দরবনে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছে। এছাড়া কোষ্টগার্ডের অভিযান ও স্থানীয় জেলেরা গনপিটুনি দিয়ে কয়েক বনদস্যুকে হত্যা করে।

এই সময়ের মধ্যে  ২০১০ সালে ৯ জন, ২০১১ সালের ১৯ জন, ২০১২ সালের ১৯ জন, ২০১৩ সালের ১০ আগষ্ট পযন্ত ১৪ জন বনদস্যূ নিহত হয়। এসময় ২৫ জন বনদস্যু কে আটক করা হয়েছে। বনে তল্লাশি চালিয়ে ২৬৩ টি দেশি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, দুই হাজার ৪৪৬ রাউন্ড গুলি, ৪৯ টি ধারালো অস্ত্রসহ দস্যুদের ব্যবহৃত বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া এই সময়ে দস্যুদের কবল থেকে জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে অপহৃত ৯০ জনকে।

চলতি ইলিশ মৌসুমের শুরুতেই বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের উপকুলে দুই লক্ষাধিক জেলে দস্যু আতংকে ভুগছে। দস্যুদের চাঁদা না দিয়ে মাছ ধরার উপায় নেই। মুক্তিপন ছাড়া অপহৃত জেলেদের মুক্তি পাওয়া দায়। এই অবস্থায় সুন্দরবনের দস্যু দমন ও জেলেদের মৎস্য আহরণ নিরাপদ করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নানা কৌশল অবলম্বন করছে। একের পর এক অভিযান পরিচালনা করে আসছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুয়াই, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৪,১৪৩ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ ও ১,৮৭৩ বর্গ কিলোমিটার জলভাগের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে বনদস্যুরা তাদের রাজত্ব কায়েম করছে।

সরকার সুন্দরবনের দস্যু দমন ও জেলেদের মৎস্য আহরণ নির্বিঘ্ন করতে জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি গঠনের মধ্যে দিয়ে দস্যু দমনে অভিযান আরো গতি পেয়েছে। বনের গহীনে র‌্যাব, পুলিশ, কোষ্টগার্ড ও বনবিভাগের সদস্যরা কখনও যৌথ আবার কখনো নিজেরা অভিযান পরিচালনা করছে। এমনকি গত বছর সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়।

সর্বশেষ ৮ আগষ্ট সুন্দরবনে মুক্তিপনের টাকা নিতে এতে কুখ্যাত বনদস্যু রুবেল বাহিনীর প্রধান রুবেলসহ ২ বনদস্যু নিহত হয় এবং ৩/৪ দিন পর বনদস্যু বাহিনীর সদস্যরা সুন্দরবনসহ বঙ্গোপসাগরে গনডাকাতি ও মুক্তিপনের দাবীতে অর্ধশতাধিক জেলেকে অপহরণ করে।

জেলেদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ মিলে এখনও ডজন খানেক বনদস্যূ বাহিনীর ৬ শতাধিক সদস্য সক্রিয়  রয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে আরো কয়েকটি বাহিনীর প্রধানের নেতৃত্বে  কয়েকশত বনদস্যু সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে।

দেশি বিদেশি অস্ত্র নিয়ে দস্যুরা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদাঁয় করছে। চাঁদার টাকা না দিলে ট্রলারে হামলা চালিয়ে জাল-মাছ লুট এবং জেলেদের অপহরন করে মুক্তি পনের টাকা আদায়  করে। মুক্তিপনের টাকা না পেলে জেলেদের হত্যা করে সাগরে ফেলে দেওয়ারও ঘটনা ঘটেছে ইতিপূর্বে।

দস্যুদের বেপরোয়া তান্ডবের কারনে জেলেরা দর্ঘদিন ধরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর দস্যুরা সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে কয়েক হাজার জেলেকে অপহরন করে মুক্তিপন আদায় করে আসছে এবং লুটে নিচ্ছে জেলেদের মাছ ও জাল। অনেক সময় দস্যুদের আগাম টাকাদিয়ে টোকেন নিয়ে মাছ ধরতে হয় জেলেদের।

এসব দস্যুতার কারনে সরকারও প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানান জেলে সংগঠনের কর্তাব্যাক্তিরা।

এদিকে, ২০১০ সালের জানুয়ারী থেকে ২০১৩ এর ১০আগষ্ট পর্যন্ত সুন্দরবন ও বনসংলগ্ন এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে ১২ বাহিনীর প্রধানসহ ৬১ জন বনদস্যু সদস্য নিহত হয়েছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে ৫৬ জন, বনদস্যু দুই গ্র“পের সংঘর্ষে ৩ জন এবং সর্বশেষ মুক্তিপনের টাকা নিতে এসে জেলেদের গনপিটুনিতে ২ জন বনদস্যু নিহত হয়।

সাড়ে তিন বছরে সুন্দরবনের যে ১২ জন বাহিনীর প্রধান নিহত হয়েছে তারা হচ্ছে ডাক্তার মানিক, কৃষ্ণ সাগর, মোতালেব জুলফিকার, সোহাগ, জিহাদ, নবকুমার, গামা, মেঘনা জাকির, নাটা শহিদুল, সাইজ্যা বাহিনীর প্রধান মাহাবুব ওরফে সাইজ্যা, আমজাদ বাহিনীর প্রধান আমজাদ ও রুবেল বাহিনীর প্রধান রুবে।

সুন্দরবনের ফিসার ম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) জিয়া উদ্দিন এই প্রতিবেদকে জানান, সুন্দরবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে মোতালেব জুলফিকার, সোহাগ, জিহাদসহ আরো কয়েক জন বাহিনীর প্রধান নিহত হওয়ার পর কিছুদিন ওই বাহিনী গুলোর কর্মকান্ড বন্দ ছিল।

কিন্তু পরবর্তীতে ওইসব বাহিনীর সদস্যরা দলের হাল ধরেছে নতুন করে নিজেদেরকে সংগঠিত করে পূনরায় তাদের তৎপরতা শুরু করেছে।

সাগর থেকে ফিরে আসা জেলেরা জানান, সুন্দরবন ও গোটা বঙ্গোপসাগর জুড়ে বনদস্যু বাহিনীর সদস্যরা তৎপরতা চালাছে। এখন সাগরে জেলেদের জন্য নিরাপদ নয়। বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন এলাকায় জেলেদের ওপর হামলার ঘটনা ও জেলেদের মধ্যে দস্যু আতংক বিরাজ করছে।

দস্যুদের তান্ডবে অনেকে আর সাগরে মাছ ধরতে যেতে আগ্রহী নয়। স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সে বিকল্প কাজ খুজে বেড়াচ্ছে।

র‌্যাপিড একশান ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব-৮) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফরিদুল আলম জানান, র‌্যাব সদস্যদের অভিযান সুন্দরবন অঞ্চলে জেলেদের  ট্রলারে ডাকাতি ও জেলে অপহরন অনেকাংশেই কমে গেছে। এ অবস্থায় র‌্যাব সদস্যরা বিশেষ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। জেলেদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্যনিয়ে দস্যুদের নতুন অবস্থানের সন্ধানে তল্লাশী চালানো হচ্ছে। সদ্যুতা দমনে সুন্দরবন হিরনপয়েন্ট ও দুবলারচরে র‌্যাবের ২টি ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

১৯ আগষ্ট ২০১৩ :: নিউজ করেসপন্ডেন্ট,
বাগেরহাট ইনফো ডটকম

ইনফো ডেস্কWriter: ইনফো ডেস্ক (1855 Posts)