নদীর শহর, প্রাণের শহর (প্রথম পর্ব)

• মেহেদী হাসান সোহেল

ভৈরব নদের তীরে দাঁড়ালে আমি আমার প্রাণ ফিরে পাই; আমার জীবনী শক্তি ফিরে পাই। যতবার বাগেরহাট যাই ততবারই নদের তীরে গিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। এই নদের তীরে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা; তাই ভৈরবের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক।

আমার জন্ম বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ থানার পঞ্চকরন গ্রামে। পুরো গ্রামের কোল ঘেষে চলে গেছে ভৈরব নদ, যা এখানে কেওড়া বা পানগুছি নদী নামে পরিচিত। বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নদী এটি।

দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখা এই নদীটির নোনা পানি বাগেরহাটবাসীর হৃদয়টা শুন্য করে দেয়। তবু এখানকার লোকের হাসি মলিন হয় না। সারাদেশের জন্য এলাকার মানুষ ত্যাগ স্বীকার করে তার বিনিময়ে বঞ্চনা ছাড়া কিছুই মিলে না।

বাগেরহাট শহরের একসময়ের প্রাণকেন্দ্র ছিল পুরান কোর্ট চত্বর, তার সাথেই ছিল বাগেরহাটের লঞ্চঘাট। এই ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে যেত বাগেরহাটের থানা মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, রামপালসহ পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, হুলারহাট অঞ্চলে। তাছাড়া প্রতিদিন রাতে এখান থেকে লঞ্চ যেত মোরেলগঞ্জ, হুলারহাট, বরিশাল হয়ে ঢাকা যেত।

লঞ্চের সময়সূচীরর সাথে তাল মিলিয়ে চলত এই শহরে মানুষের জীবন যাত্রা। সময়ের দীর্ঘসূত্রিতা আর স্থল পথে যোগাযোগের সহজলভ্যতার কারনে এখন বাগেরহাট লঞ্চঘাট একটি স্থানের নাম। আর এখানকার ব্যস্ততা কালের গর্ভে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে।

বাগেরহাট জেলা জুড়ে লতাপাতার মত নদী থাকা সত্ত্বেও নদীপথের তেমন প্রসার ঘটেনি সময়ের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে। এই দীর্ঘসূত্রিতার অন্যতম কারণ ভৈরব নদের মূলস্রোতের সাথে বর্তামানে পদ্মা, মেঘনার সরসারি মিলিত না থাকায় এবং উত্তর-পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব বরাবর সংযোগ নদীগুলো প্রবাহমান না থাকা।

এরফলে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে দক্ষিনে নেমে গিয়ে বরিশালের কীর্তনখোলা নদী ও মেঘনা নদী হয়ে ঢাকায় আসতে হয়, যা অনেক সময় সাপেক্ষ। জীবনে গতি বাড়ার সাথে এই লঞ্চপথ অপাংক্তেয় হয়ে যায়। কিন্তু বাগেরহাট প্রায় সব থানা ইউনিয়নের সাথে নদী খালের মাধমে যোগাযোগ ছিল এই শতাব্দী শুরুর দিকেও জনপ্রিয় ছিল।

খাল-বিল আর নদী-নালার শহর বাগেরহাট, তবে তা এখন মৃতপ্রায়। এই জেলার মূল নদ-নদী হলো- ভৈরব, বলেশ্বর, মংলা, পশুর, শ্যালা ও আঠারোবাকি।

বলা হয়, সীমান্তের ওপার ভারতে জন্ম হলেও যশোর, খুলনাসহ বেশ কয়েকটি জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ভৈরব। খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার নাইহাতি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবহমান আঠারবাঁকি ও রুপসা নদী ছুয়ে ফকিরহাটের মধ্যদিয়ে ভৈরব নদ প্রবেশ করেছে বাগেরহাটে।
নদটি কেন্দুয়ার বিলে পতিত হয়ে চিত্রা নদী নামে নিম্নমুখী হয়ে ‘ভৈরব নদ’ নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়ে। বাগেরহাট শহরের প্রধান বাজার পেরিয়ে নাগেরবাজারের পাশ দিয়ে এই ভৈরব দড়াটানা নদী হিসেবে প্রবাহিত হয়ে পয়লাহারা নদী হিসেবে বহমান হয়ে ‘পানগুছি নদী’ নাম ধারণ করে প্রবাহিত। পানগুছি নদী জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার মধ্যদিয়ে  নিম্নমুখে প্রবাহিত হয়ে বলেশ্বর নদী হিসাবে সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।

আঠারোবাঁঁকি আর কেন্দুয়ার বিলের মাঝের সংযোগ নদী আজ মৃত। আঠারোবাঁকি নদীটি বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের খুলনা ও নড়াইল জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি নদী।

আঠারোটি বাঁকে নদীটি প্রবাহিত হয় বলে নদীটির নাম হয়েছে আঠারোবাঁকি নদী। এই নদী রূপসা অংশের প্রবাহমান জলধারা মূলত ভৈরব নদের পরিবর্তিত নাম। আঠারবাঁকি নদী দিয়ে জাহাজ চলাচল করলেও বর্তমানে নদীটি মৃতপ্রায়। নদীটির বৃহৎ অংশ খুলনা জেলার তেরখাদা ও বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নদীতে মিলিত হয়েছে। যার ফলে আমাদের বিলগুলো তথা এই অঞ্চলে মিষ্টি পানির প্রবাহ সচল থাকত। দুই উপজেলার সীমানা নির্ধারণকারী মৃতপ্রায় এই নদীটি বর্তমান সরকার পুনঃখননের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে। এটি সম্পন্ন হলে এই অঞ্চলে নৌ যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। এককালে এই নদী দিয়ে স্টীমার, লঞ্চ খুলনা থেকে গোপালগঞ্জ, বরিশাল অতি অল্প সময়ে যেতে পারত।

খুলনা ও বাগেরহাট অংশে দুই ভৈরবের মাঝে প্রবাহমান ছিলো আঠারবাঁকি, যা উৎপত্তি ঘটেছিল উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে। কথিত আছে যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নড়াইল জেলার ধোন্দা গ্রামের রূপচাঁদ সাহা নামক জনৈক লবণ ব্যবসায়ী নৌকায় যাতায়াতের জন্য ভৈরব নদের সঙ্গে কাজীবাছা নদীর সংযোগ করার জন্য একটি খাল খনন করেছিলেন। রূপচাঁদ সাহার নাম অনুসারে ঐ খালের নাম হয়েছিল রূপসা।

পরবর্তীকালে ভৈরব নদের প্রচন্ড প্লাবনে এই ছোট খাল বিরাট ও ভয়ংকর নদীতে পরিণত হয়। রূপসা শুধু নিজেই নদীতে পরিণত হয়ে ক্ষান্ত হয়নি, কাজীবাছা নদীকেও প্রচন্ড ভাঙনের মুখে ফেলেছে।

রূপসা নদী উপত্তি ভৈরব নদ হলেও বর্তমানে স্রোতের তীব্রতা মূল নদীর চেয়ে বেশী।

রুপসা-পশুর সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বড় নদী। রূপসা মূলত দক্ষিণে মংলা বন্দরের কাছে পশুর নামে প্রবাহিত হয়ে ত্রিকোন ও দুবলা দ্বীপ দুটির ডান দিক দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

খুলনা বিভাগের মূলনদী ভৈরব যা সারা অঞ্চল জুড়ে প্রবাহমান। এই ভৈরব এক সময় গঙ্গা থেকে প্রবাহিত হত, এটি তখন জলাঙ্গীর বর্তমান তীরের মধ্যদিয়ে আরো পূর্বদিকে ফরিদপুরের দিকে প্রবাহিত হত। ভৈরব এখন আর তেমন জীবন্ত নেই। মাথাভাঙা জলঙ্গীর একটি নতুন জলস্রোত এবং অতি সাম্প্রতিক কালের আগ পর্যন্ত নদীটি হুগলীর সাথে যোগসূত্র ঘটায় চূর্ণী নদী গ্রহণের মাধ্যমে। আগেরকালে মাথাভাঙার অধিকাংশ পানি পূর্বে কুমারা, চিত্রা, কবদুক (ভৈরব) ও ইছামতিতে প্রবাহিত হত।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, আগে এই অঞ্চলের নদীগুলো দক্ষিণ-পূর্ব অভিমুখে প্রবাহিত হত, কিন্তু পরবর্তীকালে কোন শক্তি জলাঙ্গী ও মাথাভাঙ্গাকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে নিয়ে যায়। এটি ঘটার কারণ হল একটি স্থানীয় সাবসিডেন্স যা ১৭৫০ এর আগে কিছু সময় ধরে সংঘটিত হয় এবং এটি তখন থেকে অকার্যকর অবস্থায় আছে।

ভৈরব নদের তীরে খুলনা ও যশোর শহর অবস্থিত। এছাড়া এর তীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে মেহেরপুর, গাড়াবাড়ীয়া, চুয়াডাঙা, বড়বাজার, কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, দৌলতপুর, ও বাগেরহাট। হিন্দুদের কাছে নদটি পবিত্র হিসাবে সমাদৃত।

নদটির নাম “ভৈরব” এর অর্থ “ভয়াবহ”, এক সময় গঙ্গা/পদ্মা নদীর মূল প্রবাহ এই নদকে প্রমত্তা রূপ দিয়েছিল; সেই থেকেই নামটির উৎপত্তি। নদটির দুইটি শাখা রয়েছে ইছামতি নদী এবং কপোতাক্ষ নদ।

খুলনা-ইছামতীর কিছু অংশ ভারতে, এবং বাকিটুকু বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় পড়েছে — এই নদীটি সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা নির্দেশ করে।

ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া, স্থানীয় সাবসিডেন্স আর অপরিকল্পিত রাস্তা, বেড়ীবাঁধ, ব্রীজ তৈরির ফলে ভৈরব নদের উৎপত্তি স্থল মৃত।যার ফলে পদ্মার সাথে এখন আর কোন সংযোগ নাই।

যশোর জেলার বাঘেরপাড়া উপজেলা পার হলে নদীটি আর নাব্যতা বিদ্যমান। বর্ষা মৌসুমে এটি নাব্য থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নদটি শুকিয়ে যায়। তবে নদটির নিচের দিকের অংশে জোয়ার ভাটা হয়, ও তা সারাবছর নাব্য থাকে। পদ্মা থেকে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রূপসা নদীর লবনের তীব্রতা খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরের নওয়াপাড়া পর্যন্ত গ্রাস করেছে।
(চলবে…)

লেখক: বেসরকরি চাকুরিজীবী।
E-mail: mehdee19@gmail.com
 
এসআইএইচ/বিআই/১৯ এপ্রিল, ২০১৭
মেহেদী হাসান সোহেলWriter: মেহেদী হাসান সোহেল (11 Posts)