গলদা হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদনের বর্তমান চিত্র ও করণীয়

Golga-Chingri-picবাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে গলদা চিংড়ির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই খাত প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও দরিদ্রতা দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই গলদা চিংড়ি খাত বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যার সন্মুখীন। যেমন- চাষের জন্য সময়মত প্রয়োজনীয় পানির অপর্যাপ্ততা, প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন পোনার (পিএল) অপ্রতুলতা, রোগ-বালাই ইত্যাদি।

কিন্তু বর্তমানে মানসম্পন্ন গলদার পোনা সংকটই বড় সমস্যা। একদিকে প্রাকৃতিক পোনার অপ্রতুলতা, অন্যদিকে গলদা হ্যাচারিগুলোতে পোনা উৎপাদনে সমস্যা। ফলে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় পোনার সরবরাহ খুবই সামান্য। আর এ কারণে চাষি পোনার গুণগত মান বিচার না করেই অধিক মূল্যে ঘেরে পোনা মজুদ করতে একপ্রকার বাধ্য হচ্ছে।

টেকসই চাষ ব্যবস্থাপনার জন্য সময়মত ও চাহিদা অনুযায়ী পোনা সরবরাহ জরুরী। আর চাহিদা অনুযায়ী পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে গলদা হ্যাচারিগুলোতে পোনা (পিএল) উৎপাদন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পোনার উৎপাদন বাড়ানো একান্ত জরুরী। কারণ প্রাকৃতিক পোনার যোগান অনিশ্চিত এবং দিন দিন তা দ্রুত কমে যাচ্ছে, তাই অদুর ভবিষ্যতে গলদা হ্যাচারিই হতে পারে পোনা প্রাপ্তির একমাত্র নিশ্চিত উৎস্য এবং তার জন্য জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ববাজারে গলদা চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে গলদা চিংড়ির চাষ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং চাষ ক্ষেত্র দ্রুত বৃদ্ধির কারণে চাহিদার বিপরীতে পোনার যোগান কমতে থাকে। ফলে ২০০৬ -২০০৯ সালের মধ্যে সারা দেশে বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক হ্যাচারী স্থাপতি হয়।

প্রথমদিকে, হ্যাচারিগুলোতে পোনা উৎপাদন ভাল ছিল এবং প্রাকৃতিক উৎস্যের পাশাপাশি হ্যাচারী উৎপাদিত পোনার যোগানও যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বিগত ৩-৪ বছর (২০১১-২০১৪) যাবৎ হ্যাচারিগুলো পোনা উৎপাদনে সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছে এবং আশানুরুপ পোনা উৎপাদন করতে পারছে না। হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পূর্বের তুলনায় উন্নত হলেও পোনা উৎপাদনে ধারাবাহিক সফলতা মিলছে না।

বিদ্যমান সমস্যার সঠিক কারণ জানার জন্য দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞগন কাজ করছে কিš’ এখনও কোন সমাধান পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত পরিপূর্ণ গবেষনামূলক অনুসন্ধান ছাড়া এই সমস্যার নির্দিষ্ট কারন জানা কঠিন, তবে তাঁদের প্রাথমিক ধারণা বেশ কিছু কারণ এজন্য দায়ী হতে পারে। যেমন-

  • অনিয়ন্ত্রিত (প্রাকৃতিক উৎস্য) পরিবেশ থেকে ডিমওয়ালা চিংড়ি সংগ্রহ
  • হ্যাচারিেেত ব্যবহৃত পানির কোন কোন উপাদান (প্যারামিটার) অনুকূলে না থাকা, যা লার্ভার বৃদ্ধিও জন্য একান্ত প্রয়োজন
  • অধিক ঘনত্বের লবনাক্ত পানির (ব্রাইন) ব্যবহার
  • হ্যাচারিতে ডিমওয়ালা চিংড়ির জন্য পৃথক জায়গা না থাকা
  • আর্টিমিয়া হ্যাচিং ও সংগ্রহের পৃথক জায়গা না থাকা
  • সনাতনি পদ্ধতিতে পানি তৈরী এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করা
  • বায়োসিকিউরিটি ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব
  • অদক্ষ লোকবল দ্বারা হ্যাচারী পরিচালনা ইত্যাদি।

এই বাস্তবতায় অ্যাকুয়াকালচার ফর ইনকাম এ্যান্ড নিউট্রিশন (এআইএন) প্রজেক্ট, ওয়াল্ডফিশ-বাংলাদেশ ২০১৩ সাল থেকে ছোট পরিসরে গলদা হ্যাচারি নিয়ে কাজ করছে। উদ্দেশ্য হলো সফলভাবে পোনা উৎপাদনের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরী করা যাতে হ্যাচারীগুলোতে পোনা উৎপাদানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং পর্যায়ক্রমে তা আরও বৃদ্ধি পায়। বাস্তবতা হলো বর্তমানে গলদা হ্যাচারিগুলো যে পর্যায়ে আছে সেখান থেকে ধারাবাহিক সফলতায় নিয়ে আসা খুব সহজ নয়, এজন্য সময় ও কার্যকরী পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বাগদা হ্যাচারিগুলো বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও টেকনিসিশয়ান দ্বারা দীর্ঘদিন পরিচালিত হওয়ায় এবেং অনেক দেশীয় লোক তাদের সাথে কাজ করার সুবাদে আমাদের দেশীয় লোকবল যথেষ্ঠ প্রশিক্ষিত ও দক্ষতা অর্জন করেছে এবং বর্তমানে তারাই বাগদা হ্যচারিগুলো পরিচালনা করছে। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে গলদা হ্যাচারিগুলোও প্রশিক্ষিত ও দক্ষ লোকবল দ্বারা পরিচালিত হবে এবং পোনা উৎপাদনে ধারাবাহিক সফলতা অর্জন করবে।

২০১৩ সালে এ,আই,এন-ওয়ার্ল্ডফিশ-এর ২টি পার্টনার হ্যাচারীতে উন্নতমানের উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞের (ডঃ ম্যাথিউ -থাইল্যান্ড) পরামর্শ ও পদ্ধতি অনুসরন করে আশানুরুপ পোনা উৎপাদিত হয়েছিল। উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করে ২টি হ্যাচারিতে প্রায় ৮ মিলিয়ন পিএল উৎপাদিত হয়।

এছাড়াও এআইএন ২০১৩ সালে হ্যাচারি মালিক, হ্যাচারি টেকনিশিয়ানও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে ২টি অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা এবং পরবর্তিতে ১৭টি হ্যাচারির ২৫ জন (মালিক ও টেকনিশিয়ান) -কে নিয়ে সপ্তাহব্যাপি একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রজেক্ট ২০১৪ সালে ৫টি হ্যাচারির সাথে কাজ করে এবং ১টি উৎপাদন চক্র থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি পিএল উৎপাদিত হয়। তবে ২-৩টি হ্যাচারিতে সমস্যার কারণে আশানুরুপ পোনা উৎপাদিত হয়নি।

এই চলমান সমস্যা খতিয়ে দেখার জন্য ২ জন বিদেশী বিশেষজ্ঞ (ডঃ শেঠি ও ডঃ নায়ার- ভারত) হ্যাচারি চলাকালীন হ্যাচারির বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং হ্যাচারিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উৎস্যের পানি ও লার্ভার বিভিন্ন পর্যায়ের নমূনা সংগ্রহ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যকটেরিওলজি ও কেমিক্যাল্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেন।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, রুপসা হ্যাচারিতে ব্যবহৃত রুপসা নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশ ছিলো, বিশেষ করে ব্যাক্টেরিয়ার লোড অনেক বেশী এবং এর মধ্যে vibrio ব্যাকটেরিয়াও ছিল যা চিংড়ির লার্ভার জন্য খুব ক্ষতিকর। এছাড়াও অন্যান্য নদীর (বাগেরহাট, মোল্লাহাট, পিরোজপুর) পানিতেও ব্যাকটেরিয়ার লোড মাত্রার চেয়ে বেশী ছিল।

উল্লেখ্য,এই সকল নদীর পানি ব্যবহারকারী হ্যাচারিগুলোই বেশী সমস্যার সন্মুুখীন হয়েছে। এছাড়াও ২০১৪ সালে দেশের বেশীরভাগ গলদা হ্যাচারিই পোনা উৎপাদনে ব্যপক সমস্যার সন্মুখীন হয়েছে।

তবে এই চলমান সমস্যার প্রকৃত কারণসমূহ চিহ্নিত করে গলদা হ্যাচারিগুলোকে সাফল্যজনকভাবে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকরি উদ্যোগ। এক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর প্রধান ভুমিকা পালন করতে পারে এবং ওয়ার্ল্ডফিশসহ অন্যান্য সংস্থাসমূহ সহযোগী ভুমিকা পালন করতে পারে।

গলদা হ্যাচারিতে চলমান সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য পদক্ষেপ সমূহ হতে পারে-

১. হ্যাচারিতে ব্যবহৃত সকল প্রয়োজনীয় উপকরণের নমূনা পরীক্ষার জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত ল্যাবরেটরি  স্পাপন ও সেটি পরিচালনা ও বিশেষভাবে কার্যকর রাখার জন্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ লোকবল নিশ্চিত করা।

২. দেশী-বিদেশী গলদা হ্যাচারি বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত টিম দ্বারা সম্ভাব্যতা যাচাইপূর্বক বিশেষ হ্যাচারি অঞ্চল নির্বাচন

৩. হ্যাচারিতে সফলভাবে উৎপাদন পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। যেমন-

ক) হ্যাচারিতে উৎপাদন উপযোগী পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা
খ) উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণসমূহের গূণমান পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা
গ) হ্যাচারি পরিচালনার জন্য উচ্চ শিক্ষিত দক্ষ জনবল তৈরীর পদক্ষেপ গ্রহন
ঘ) পানি তৈরীর জন্য বাগদা হ্যাচারির মত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা
ঙ) ডিমওয়ালা চিংড়ি ও আর্টিমিয়া হ্যচিং-এর জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করা

৪. সফলভাবে পোনা উৎপাদন নিশ্চিত করা ও দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরীর লক্ষে বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ান দ্বারা প্রশিক্ষণমূলক হ্যাচারি পরিচালনা (২-৩ বছর) ; বাগদা হ্যাচারিতে যেটি সফল হয়েছে।

৫. দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ান দ্বারা গঠিত প্রশিক্ষণ টিম দ্বারা দেশীয় হ্যাচারি টেকনিশিয়নদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা

৬. অনিয়ন্ত্রিত উৎস্য থেকে ব্রুড সংগ্রহ নিরুৎসাহিত করা, এজন্য ব্রুড ব্যাংক তৈরীর জন্য জরুরী পদক্ষেপ গ্রহন।

লেখকঃ
সুকুমার বিশ্বাস
প্রন হ্যাচারী কো-অর্ডিনেটর, এআইএন প্রজেক্ট, ওয়ার্ল্ডফিশ-বাংলাদেশ।
মোবাইল: ০১৭১২-২০২১৩০

Writer: Bagerhat Info Blog (51 Posts)