ব্রাহ্মণ, কুমীর এবং শিয়াল পণ্ডিতের গল্প

একদা ছিল এক ব্রাহ্মণ। একই সাথে তার ছিল অসামান্য পাণ্ডিত্য এবং অনেক যজমান। সে যজমানদের বাড়িতে বাড়িতে পূজা-অর্চনা করত এবং তার দ্বারা ভালোভাবে পরিবারের ব্যয়ভার বহন করত।

একদিন সে লক্ষ্মীপূজা করতে গিয়েছিল। অনেক বাড়ি পূজা করার পর প্রত্যেক বাড়িতে তাহাকে কিছু না কিছু খেতে হয়েছিল। এভাবে খেয়ে খেয়ে তার পেটের অবস্থা তো ছিল টইটুম্বুর। পথে আসার সময় তার কাছে ছিল প্রসাদের (বিভিন্ন রকম ফল-মূল, মিষ্টি, চিড়া, খই, নাড়ু, লুচি ইত্যাদি) তিন/চারটা থলে এবং একটি পুরোহিতদর্পণ (পূজা করার নিয়মাবলী সম্বলিত বই)। কিছুক্ষণ পথ অতিক্রম করার পর ব্রাহ্মণের টয়লেটের বেগ আসলো। টয়লেটের বেগ এতোটা ছিল যে ব্রাহ্মণ তাহা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রাস্তার একপাশে তাহার প্রসাদের থলে এবং পুরোহিতদর্পণটা রেখে একটা ঝোপের পিছনে প্রকৃতির কাজ সারার জন্য বসে পড়ল।

হঠাৎ সেই পথের ঝোপের কোল ঘেঁষে এক শিয়াল যাচ্ছিল। প্রসাদ, নাড়ু ইত্যাদির গন্ধ শিয়ালের নাকে গেল। শিয়াল ব্রাহ্মণের প্রসাদের থলের নিকটে গেল এবং তাহার ইচ্ছামত সন্দেশ, নাড়ু, মিষ্টি, খই, চিড়া, বাতাশা খেতে লাগল। কিন্তু এইদিকে, শাস্ত্রীয় নিয়মানুসারে, টয়লেট করার সময় ব্রাহ্মণের পৈতা ব্রাহ্মণের কর্ণে উঠানো ছিল এবং সেই সাথে তার কথা বলাও নিষিদ্ধ ছিল। ব্রাহ্মণ তখন কি করবে?- বুঝতে পারছিল না। সে মুখ বুজে অস্ফুট স্বরে হুম, হুম, হুম……(মুখ বন্ধ থাকা অবস্থায় যে রকম শব্দ করা যায়) শব্দ করতে লাগল। সেই শব্দ শিয়াল কি আর বোঝে? বুঝে না। শিয়াল তাহার ইচ্ছামতো পেটভরে প্রসাদ খেল এবং যাওয়ার সময় ব্রাহ্মণের পুরোহিত দর্পণটা মুখে করে নিয়ে গেল। ব্রাহ্মণ ওই একই রকম শব্দ হুম হুম…… করতে লাগল এবং শিয়ালের বদমায়েশী দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।

শিয়াল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে একটা নদীর কাছে আসল। বইটি মাটিতে রেখে শিয়াল জলপান করে পুনরায় পুরোহিতদর্পণটি মুখে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কিছু দূরে যাওয়ার পর তার সাথে একটা মা কুমীরের দেখা হল। কুমীর ডাঙ্গাতে তার ছোট ছোট সাতটি বাচ্চা নিয়ে রৌঁদ্রুর পৌঁহাতে ছিল। শিয়ালের মুখে বই দেখে কুমীর জীজ্ঞাসা করল যে, “পণ্ডিত মহাশয়, আপনার মুখে বই কেন?” তখন শিয়াল একটু ভাব নিয়ে বলল, “যেহেতু আমি পণ্ডিত মহাশয়, সেহেতু আমি তোমার মতো বেকার বসে থাকি না, আমার অনেক দায়িত্ব। আমি বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র-ছাত্রী পড়াই। আমার ছাত্র-ছাত্রী এখন অনেক বড় বড় জায়গায় তাদের স্বীয় প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং মেধা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তাহলে, বুঝতেই পারছ, আমি ছাত্র পড়াতে গিয়েছিলাম। এই জন্যই মুখে বই’’।

শিয়ালের এই কথা শুনে, তখন কুমীর বলল যে, “পণ্ডিত মহাশয়, আমি তো আর লেখা-পড়া করতে পারিনি পারিবারিক অভাব-অনাটনের কারণে। কিন্তু আমি আমার বাচ্চা গুলোকে আপনার মত পণ্ডিত বানাতে চাই’’। শিয়াল বলল, “খুব ভালো কথা”। কুমীর পুনরায় বলল যে, “পণ্ডিত মহাশয়, আপনি কি আমার বাচ্চা গুলোকে পড়িয়ে দিতে পারবেন?’’ শিয়াল একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “পারবো না কেন? আমি তো পড়াই। তবে আমি তো ফ্রি পড়াই না। আমাকে মাইনা (বেতন) দিতে হবে এবং আমার বাড়িতে রেখে পড়াতে হবে’’। কুমীর তখন বলল, “আমি টাকা পয়সা কোথায় পাবো? মাইনা বাবদ আপনাকে প্রতিদিন একটা করে বড় মাছ দিব। তবে শর্ত একটা, “প্রতিদিন মাছ দেয়ার পর আমার বাচ্চা গুলোকে একবার করে দেখাতে হবে’’।’’

শিয়াল ভাবল, ব্যাপারট মন্দ না। প্রতিদিন তো একটা করে বড় মাছ পাওয়া যাবে। এরপরে, কুমীর তার বাচ্চাগুলোসহ শিয়ালের বাড়িতে গেল এবং বাচ্চাগুলো রেখে কুমীর চলে আসল। শিয়াল থাকত একটা গুহার ভিতর। কুমীরের বাচ্চাগুলোকে সে সেখানে রাখল।

ধূর্ত শিয়াল সেই দিন রাত্রে কুমীরের একটা বাচ্চা খেয়ে ফেলল। পরের দিন সন্ধ্যার কিছু আগে নদী থেকে একটা বর মাছ ধরে নিয়ে কুমীর শিয়ালের বাসায় গেল। কুমীর বলল, “পণ্ডিত মহাশয়, এই নিন আপনার প্রতিদিনের ফি বাবদ মাছ এবং এখন আমার বাচ্চাগুলোকে দেখান”।

শিয়াল তো অনেক চালাক। সে বলল যে, “এখন তাহারা আলাদাভাবে তাদের নিদিষ্ট কক্ষে পড়িতেছে। সবাই একসাথে আসতে পারবে না”। এরপর শিয়াল প্রতিবারে সবগুলো বাচ্চা না দেখিয়ে এক এক করে বাচ্চাগুলো এনে দেখালো এবং একটি বাচ্চা দুইবার দেখলো। এভাবে সে ছয়টি বাচ্চাকে মোট সাতবার দেখালো। কুমীর শিয়ালের চালাকি বুঝতে পারল না। সেইদিনের মতো কুমীর চলে গেল।

পরের দিন কুমীর আসল না। এই দিনও শিয়াল কুমীরের আর একটি বাচ্চা খেয়ে ফেলল। তার পরের দিন কুমীর একই সাথে দুটি মাছ নিয়ে শিয়ালের বাড়িতে গেল এবং শিয়ালকে বলল যে, “পণ্ডিত মহাশয়, আমার গতকাল অনেক কাজ ছিল বলে আসতে পারিনি। কিন্তু আপনার দুইদিনের প্রাপ্য পাওনা নিয়ে এসেছি। যদি আমি দুই-এক দিন না আসতে পারি, এই নিয়ে আপনি মোটেও চিন্তা করবেন না। আপনি প্রতিদিনের প্রাপ্য পাওনা একসাথে বুঝে পাবেন”। এরপর, কুমীর তার বাচ্চাগুলোকে দেখতে চাইল। শিয়াল আগের মতো একইভাবে এক এক করে পাঁচটি বাচ্চাকে সাতবার দেখালো।

তারপরের দুইদিন কুমীর আর আসল না। দুইদিন এর পর তিন দিনের মাথায় কুমীর আসল এক সাথে তিনটি মাছ নিয়ে। এই দুইদিনে শিয়াল কুমীরের আরও দু’টি বাচ্চা খেয়ে ফেলল এবং একইভাবে কুমিরের তিনটি বাচ্চাকে এক এক করে সাতবার দেখাল।

তাহার পরের দিন কুমির আর আসল না। এর পরের দিন কুমির আসল। একইভাবে কুমির শিয়ালকে মাছ দিল এবং শিয়াল তার দু’টি বাচ্চাকে সাতবার দেখাল। এভাবে শিয়াল কুমিরের সাতটি বাচ্চা খেয়ে ফেলল।

বাচ্চা দেয়ার দশদিনের মাথায় কুমির আবার মাছ নিয়ে আসল এবং শিয়ালকে বলল তাহার বাচ্চা দেখাতে। শিয়ালতো কুমিরের সবগুলো বাচ্চা খেয়ে ফেলেছে। সুতরাং, সে কিভাবে বাচ্চা দেখাবে? তখন শিয়াল নতুন ফন্দি (দুষ্ট বুদ্ধি) আটল। শিয়াল কুমিরকে বলল, “আপনার বাচ্চাদের পরীক্ষা চলতেছে। এখন তাদের ডিস্টার্ব করা যাবে না। ডিস্টার্ব করলে পরীক্ষার ক্ষতি হবে, অন্য একদিন দেখাব”। এই কথা শুনে কুমির ভাবল, পরীক্ষার সময় ডিস্টার্ব করা ঠিক হবে না। সেইদিন কুমির খুশিমনে বাড়ি চলে গেল।

এইভাবে বেশ কয়েকদিন চলল। কুমির তো তার বাচ্চা দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। মায়ের মন বলে কথা! শত বাধা এবং কষ্টতেও সে কখনো তার বাচ্চাদের গায়ে এতটুকু পর্যন্ত আঁচড় লাগতে দেয়নি। সেই বাচ্চাকে আট-দশ দিন ধরে দেখে না। কুমির ধৈর্য হারিয়ে এর দুই-এক দিন পর শিয়াল কে বলল, “পণ্ডিত মহাশয়, আজ আমার বাচ্চাগুলোকে আপনার দেখনো লাগবেই। শিয়ালের তো সেই একই কথা, ‘পরীক্ষা’। কিন্তু কুমির জোরাজুরি করতে লাগল।

অবশেষে শিয়াল বলল, “তোর বাচ্চা নেই। সবগুলো খেয়ে ফেলেছি। এখন তোকে খাব’’। এই কথা শুনে কুমির লাফাতে লাফাতে নদীর পানিতে এসে পড়ল। কারণ, পানিতে সে যতটা শক্তিশালী,- ডাঙ্গাতে সে ততটা দুর্বল। কুমির প্রতিজ্ঞা করল যে, শিয়ালকে সে দেখে নেবে এবং যেভাবে হোক তার বাচ্চা খাওয়ার প্রতিশোধ নিবেই নিবে।

কুমিরতো ওৎ পেতে পানির ভিতর বসে থাকে এবং লক্ষ্য রাখে কখন শিয়াল পানি পান করতে আসে। বনের আশে-পাশে ঐ নদীতে ছাড়া আর কোথাও পানি নেই। কুমির জানে শিয়ালকে একদিন না একদিন পানি পান করতে নদীতে আসতে হবে। যখন শিয়াল পানি পান করতে আসবে, তখন তাকে ধরবে। কিন্তু শিয়াল তো অনেক চালাক। সে কখনো নদীতে আসে না পানি পান করতে কুমিরের ভয়ে। পানি না পান করে শিয়ালের তো আর পারছে না। তার তো জীবন যায় যায় (খুবই খারাপ) অবস্থা।

অবশেষে, শিয়াল নদীতে আসল পানি পান করতে। কুমির দূর থেকে শিয়ালকে দেখতে পেল। শিয়াল যখন নদীতে পানি পান করতেছিল, কুমির তখন ডুব দিয়ে শিয়ালের কাছে এসে শিয়ালের পা টেনে ধরল। শিয়াল বুঝতে পারল, কুমির তার পা ধরেছে। এখন সে কি করে? তখন শিয়াল নতুন একটি ফন্দি আটল এবং কুমিরকে বলল যে, “তুই তো অনেক বোকা, ধরবি ধরবি আমার পা ধরবি। আর তাহা না ধরে ধরেছিস আমার লাঠি”।

কুমির তখন বলল, “কি বললি তুই, আমি লাঠি ধরেছি”। কুমির শিয়ালের কথা বিশ্বাস করে শিয়ালের পা ছেড়ে দিয়ে লাঠি ধরতে গেল এবং তখনই শিয়াল লাফ দিয়ে ডাঙ্গাতে উঠলো। এরপর শিয়াল কুমিরকে বলল, “আমার সাথে তুই পারবি? আমি হলাম এই বনের একমাত্র পণ্ডিত মশাই। কেউ পারলো না বুদ্ধিতে আমার সাথে; আর তুই কোথাকার এক জ্ঞান-বুদ্ধিহী্ন লেজওয়ালা অপরিচ্ছন্ন জলের পোকা”। কুমিরকে শিয়াল পুনরায় “গুড বাই” বলে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলো এবং শিয়ালের জীবদ্দশায় শিয়াল আর ঐ নদীর ধারে-কাছে আবার গিয়েছিল কি না তাহা আমার জানা নেই।

কিন্তু আপনারা কি জানেন? শিয়াল ঐ নদীতে আবার জলপান করতে গিয়েছিল কী ?? যদি ইনফরমেনশনটা আপনাদের জানা থাকে, তাহলে, প্লিজ, অবশ্যই মনে করে আমাকে জানাবেন? জানাতে ভুল করবেন না কিন্তু ???

উৎসর্গঃ আমার পরম শ্রদ্ধেয় পরলোকগত গ্রাম্য প্রতিবেশী মহিলা অবলা রানী ভট্টাচার্যকে।

সারকথাঃ ‘‘কাউকে না জেনে শুনে অন্ধের মত বিশ্বাস করা অথবা তার কাছে কোন কাজ করতে দেয়া ঠিক নয়। আর যদি এই রকম কোন কিছু করা হয়, তাহলে পরিণামে কুমীরের বাচ্চার ভাগ্যে যাহা ঘটেছিল, সেই রকম ভয়াবহ ঘটনা মানুষের জীবনে ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’’

গল্পের পটভূমিঃ গল্পটা কেমন হয়েছে, আমাকে জানাবেন। এই গল্পটা হয়তো আপনারা আগেও শুনে অথবা পড়ে থাকবেন। তবে আমি এটি নিজের মত করে লিখেছি। এই গল্পটা আমি আমাদের গ্রামের এক বৃদ্ধা মহিলা “মহারানীর” (আমরা বৃদ্ধাকে ‘মহারানী’ বলে ডাকতাম কিন্তু উনার আসল নাম ছিল অবলা রানী ভট্টাচার্য) কাছ থেকে শুনেছিলাম, যিনি এখন আর বেঁচে নেই। অনেক আগে শুনেছিলাম তো, কোথাও কিছুটা মিসটেক হতে পারে। তারপরও কোথাও কোথাও আমি নিজের মত করে শব্দ এবং বাক্য চয়ন করেছি। উল্লেখ্য যে, এই বৃদ্ধার কাছ থেকে আমি রূপকথার প্রায় সব ধরণের গল্প শুনেছিলাম এবং এই গল্পটা শুনেছিলাম আমি যখন ক্লাস ফোর অথবা ফাইভে পড়ি (আর এখন আমি মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের থিসিস সেমিস্টারের ছাত্র)।

যদি গল্পটা পড়ে আপনাদের ভাল লাগে তাহলে আমার গল্প লেখার কষ্টটা সার্থক হবে। আপনাদের জন্য এই প্রথম আমি গল্পটা লিখেছি। এর আগে আমি কখনো গল্প লিখিনি। তবে এর আগে আমি অনেক কবিতা লিখেছি। এই যে গল্পটা লিখলাম, এটা কোন রূপকথার গল্প না। এরপর, হয়তো রূপকথার একটা গল্প লিখব এবং গল্পটার নাম হবে “ফুল কুমার ও দুধ কুমার”।

| বি.কে. রায় মুখার্জী

স্বত্ব ও দায় লেখকের…

বি.কে.রায়মুখার্জী (বাবু)Writer: বি.কে.রায়মুখার্জী (বাবু) (6 Posts)