টানাপোড়েন-৭: স্বরস্বতী এখন রেক্সনা | সুব্রত মুখার্জী

সুব্রত কুমার মুখার্জী

Image-finger-handমহাদেব বাড়ুজ্যের পাচটি মেয়ে। পাশের বামুন পাড়ার মতে মহাদেব বামুন না। সে নাকি বামুনেরা যা যা করে তা করে না আরও কত কি? মেয়ে গুলো গুনে স্বরস্বতী না হলেও দেখতে যেন স্বরস্বতী নয় দূর্গা। বড় মেয়ের নাম তার ঠাকুরদা রেখেছিলেন স্বরস্বতী। তার পরের গুলির নামকরণ আর কেউ করেনি। তবে শেষেরটির নাম রেখেছিলে পাশের বাড়ির বুড়ি আন্না। বুড়ি বুঝতে পেরেছিল আর দরকার নেই। মহাদেব বুঝতে চেষ্টাও করত যদি অর্ধাঙ্গিনী পৃথিবীতে থাকতেন।

বড়মেয়ে স্বরস্বতী পরের বোনগুলোকে নিজের মেয়ের মত মানুষ করতে লাগল। মহাদেব বাড়ুজ্যের আয় বলতে জমির ধান, পুকুরের মাছ আর বাগানের ফল। কিন্তু কে মাছ ধরবে কে ধান লাগাবে। মহাদেব বাড়ুজ্যের সময় নেই। সে তো পটুর বিড়ি খেতে খেতে সময় পায় না কোন কাজ করার।

বাড়ির পাশে আমান শিকদারদের বাড়ি। আমান শিকদার স্বরস্বতীর সমবয়সী বা একটু বড়। সেই বাড়ির কাজ করে দেয়। আমানের উপর লক্ষ্মীর আর্শীবাদ না পরলেও কার্তিকের স্নেহ খুবই পেয়েছে। এলাকায় কোন একটি ঘটনা হলে আমান শিকদার তার নেতৃত্বে। সকলের মত কাজ গুলি নাকি ভাল না। তবে আমান মনে করে এগুলোই সঠিক।

বাড়ুজ্যের পাড়ার নাকের সামনে দিয়ে একদিন আমান বিয়ে করল স্বরস্বতীকে। জাত গেল। একঘরে হল মহাদেব বাড়ুজ্যে। তার কি আসে যায়। বামুনরা কি তাকে পটুর বিড়ি কিনে দেবে। কিছুদিন আমান মহাদেবের বাড়ি না গেলেও স্বরস্বতীর পরের বোনটি যমুনার কান্নায় যেতে বাধ্য হল। না হলে ধান সব যে কাদা হয়ে যাবে।

মুসলিম পাড়ার নেতারা বলল, তা আমান যাই করনা কেন হিন্দু মেয়ে তো ঘরে রাখা যায় না। ওকে ধর্মান্তরিত করাও। ধর্মান্তরিত তাতে কারওরি কিছু যায় আসে না। স্বরস্বতী হল রেক্সনা পারভীন। নামে কি যায় আসে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাই কাজ। আমানের বউ হওয়ায় এখন আর কেউ বলে না স্বরস্বতী বেড়াতে যাবি নাকি? কিছুদিন যেতে না যেতে আমানের নামে কোর্টে কেচ (মামলা) করল বামুন পাড়ার দুলু আর শেখ পাড়ার রাজ্জাক।

আমান নাকি দুলুর বাড়ি ডাকাতি করেছে, সাক্ষি রাজ্জাক। ডাকাতি মাঝে মাঝে করত আমান, তবে এবার করে নি। সাজান কেচ আরও কঠিন। থানা থেকে ধরে নিয়ে গেল আমানকে। থানা থেকে কোর্টে চালান দিল। মহাদেবের পাশে এতদিন আমান ছিল কিন্তু আমানের পাশে কে দাড়াবে। ডাকাতের পাশে মানী জ্ঞানী গুনী লোক দাড়াতে পারে? রেক্সনা শুরু করল কোর্টে যাওয়া। কোর্টের বারান্দায় হাটতে হাটতে বুঝতে পারল কিছুই হবে না।

উকিল সাহেব দিনে সময় দিতে পারেন না শুরু হল সন্ধ্যার পর কেচ নিয়ে আলোচনা। রেক্সনা বুঝতে পারল আমান এত সহজে ছাড়া পাবে না। এতদিন ছিল হিন্দু ঘরের মেয়ে, সংখ্যালঘু। সকলেই নজর দিত। আজ আমানের বউ রেক্সনা উকিলের দাবি মেনে নিয়ে তার ফি দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করল। তারিখের পর তারিখ। চেয়ারম্যান মেম্বর সকলের সাথে দেখা করল রেক্সনা। বছর ঘুরতে ঘুরতে ছাড়া পেল আমান।

হাজতের ভিতরে থেকেই তার বউয়ের কথা কানে এসেছে। বাড়িতে এসেই এক তালাক, দুই তালাক বান তালাক দিল রেক্সনাকে। আমান বিয়ে করল মাহাদেব বাড়ুজ্যের আরেক মেয়ে যমুনাকে। যমুনা ধর্মান্তরিত হয়ে হল হাসিনা।

রেক্সনা এখন সংরক্ষিত আসনে মহিলা সদস্য। সে বিভিন্ন সভা সমাবেশে যায়। মহিলারা এখন দেশটা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমানকে ১০০ জুতার বাড়ির শালিশ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেবের কাছেই বসেছিল রেক্সনা। সে চাইলে পারত চেয়ারম্যান সাহেবকে বলে এবারের মত ছেড়ে দিতে কিন্তু কেন? সে এখন ইচ্ছা করলেই আমানকে দেশান্তরিত করতে পারে।

সেই বামুন পাড়ার দুলু সেদিন এসেছিল। তার নাকি কতটুকু জমি আছে বেচা দরকার। রেক্সনা দুলুর দিকে অবজ্ঞার সুরে বলল, ‘কয়টাকা লাগবে’। জমিটা রেক্সনা ছোট বোন আন্নার নামে কিনেছে।

মহাদেবের সাথে রেক্সনার সম্পর্ক না থাকলেও আমানের সাথে রয়েছে শ্বশুর জামাইয়ের সম্পর্ক। রেক্সনার চেহারায় অনেক দু:খের চিহ্ন থাকলেও কোথাও রয়েছে একটা ভালবাসা। সে ভুলতে পারে না তার বোনদের। যমুনার নামে ব্যাংকে কিছু টাকা রেখে পাস বই পাঠিয়েছে।

বিছানায় গেলে ঘুম আসে না রেক্সনার। ডাক্তার তাকে ঘুমানোর জন্য যে দাওয়াই দিয়েছে, তার পরও ঘুম আসে না। তবে একটাই সান্ত্বনা এলাকার ডাক্তার, মেম্বর, চেয়ারম্যান গণ্যমান্য সব ব্যাক্তিবর্গ এখন রেক্সনার ভক্ত।

এসআইএইচ/বিআই/২৪ জুন, ২০১৬

Writer: Subrata Mukerjee (25 Posts)

উন্নয়ন কর্মী