‘মানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না’– মোহাম্মদ রফিক (০৫)

কবি মোহাম্মদ রফিকে সাক্ষাৎকার: চতুর্থ অংশের পর

mohammad-rofiqশিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনুপম সেনের সাথে আপনার সম্পর্ক কিরকম ছিল?

মোহাম্মদ রফিক : অনুপম সেন অনেক দিল দরিয়ার মানুষ, সে সবাইকে খাওয়াতো টাওয়াতো। ঢাকায় এটা নিয়ে কিছু কটূক্তিপূর্ণ কথা ছড়ায়। তারপর আমি যখন কলকাতা গেলাম, তখন দেখলাম ওর একটা কবিতা অনুদিত হয়েছে। বইমেলায় ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ও এমন একটা ভাব নিল যে, সে খুব বড় একজন কবি তা সে আগে থেকেই জানতো এবং আমরা কেন এটা বুঝি নি!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক : আমি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় খুব অবাক হয়ে গেলাম। একজন লোকের একটা কবিতা ছাপা হয়েছে ভালো কথা, অনুবাদে, কিন্তু সেটা থেকে তো এত গর্ববোধ করার কারণ নেই।

আর আমি বাংলা একাডেমির পুরস্কারের ব্যাপারে,

আসলে আমি পুরস্কার টুরস্কারকে অত বড় ভাবে দেখি না।

আগের বছর যেদিন পুরস্কার ঘোষণা হবে, হলো না। আর কি সবার প্রতিক্রিয়া! আমি তখনও বই বিক্রি করি আমার টেবিলে। সে (হুমায়ূন আজাদ) এসে আমার টেবিলে, তখন বাংলা একাডেমিতে নাসির আলি মামুনের ছবির প্রদর্শনী চলছে, লেখকদের পোট্রেইট নিয়ে প্রদর্শনী। সে এসে আমাকে প্রস্তাব দিল, “চলেন সব নামিয়ে ফেলি, ভেঙ্গে ফেলি। হাঁ, কত বড় সাহস, এই লোক বলল পুরস্কার দেবে, বলেছে দেবে, এখন বলছে দেবে না। নামিয়ে ফেলি চলেন”। আমি তো অবাক। আমি বললাম, সাবধান। মামুন না আপনারও ছবি তুলেছে, আর আপনি ওর প্রদর্শনী নামিয়ে ফেলবেন! আশ্চর্য! সুতরাং ওর কিছু ব্যাপারে আমার আপত্তি ছিল। এবং পরবর্তীকালে ওর কবিতার যে ভূমিকা তাও ঠিক কবি সুলভ বা সুবিবেচনা প্রসূত মনে হয় নি আমার।

12789802_1096679863705890_385933102_oনাতির সঙ্গে একটি অবকাশ-মুহূর্ত

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একুশে পদক পেলেন ২০১০ সালে। আপনি তো বললেনই স্যার, পদক বা পুরস্কারের ব্যাপারে, পুরস্কারে কারও লেখার কোনো মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু স্যার, ঐ যে টিকেটের দাম অর্ধেক রাখা, অজস্র কবিতা পাঠকের ভালোবাসা, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, ঐ রকম পুরস্কার তো  প্রচুর পেয়েছেন। মানুষের ভালোবাসার পুরস্কার।

মোহাম্মদ রফিক : হাঁ, মানুষের ভালোবাসার পুরস্কার প্রচুর পেয়েছি। রাইট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সেটার তো মূল্য দেন, স্যার?

মোহাম্মদ রফিক : অবশ্যই। মানুষের ভালোবাসাকে আমি মূল্য অবশ্যই দেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যে কবির জনম আপনি কাটালেন স্যার, সেই কবি জনমের কোনো অতৃপ্তি কি আছে?

মোহাম্মদ রফিক : না, আমি লিখছি প্রচুর। এমন আরেকটা কথা আমি তোমাকে বলতে চাই।



একজন কবি সবসময় তাঁর সমস্ত লেখার জন্য জনগণের কাছে পরিচিত হয় না।



যেমন, নজরুল, কাজী নজরুল ইসলামকেই ধরো, আমরা তাঁকে চিনি বিদ্রোহী কবিতার জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বি স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : হাঁ সবাই। কিন্তু এটাই কি তাঁর পরিচয়?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাঁর আরও বহু ভালো লিখা আছে।

মোহাম্মদ রফিক :  জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেন বা রূপসী বাংলা। কিন্তু এটাই কি তাঁর পরিচয়?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ।

মোহাম্মদ রফিক : এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বাহন। এখন খোলা কবিতা লোকের ভালো লেগেছিল, এটা আমার নিজের প্রাপ্য। আমি কিন্তু নিজে খোলা কবিতা নিয়ে খুব উৎসাহী ছিলাম না। আমি মনে করতাম যে, এটা আমার রাজনৈতিক কর্মেরই একটা অংশ। এটা ঠিক ইয়ে না। মানে কবিতা হিশেবে খুব উচ্চস্তরের না। আমাকে প্রথম আশ্বস্ত করল মঞ্জুর-এ-মওলা। সে আমাকে একদিন কথায় কথায় বলল, এটা ঠিক না। এটা কবিতা হিসেবেও ভালো। তারপর অরুণ সেন, তাঁর প্রতিক্ষণ থেকে নির্বাচিত কবিতায় পুরো কবিতাটা ঢুকিয়ে দিল। আমি দেখে অবাক হলাম। সে বলল ‘হাঁ’ তারপর আমি আরও অবাক হলাম। আইওয়া ইউনিভার্সিটির একটা ওয়েব সাইট। ওখানে গেলে তুমি দেখবে, ওখানেও পুরো কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেছে। এবং ওরা আমাকে বার বার বলেছে যে, তুমি এই প্রচারে এত বিমুখ কেন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি একটু বেশিই প্রচার মাধ্যম অবান্ধব, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : আমি প্রচার মাধ্যম এত বিমুখ কেন? এটা তুমি প্রচার করে, অনুবাদ করে করে অামেরিকানদের বিস্মিত করো না কেন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার মধ্যে এই প্রচার বিমুখতার কারণ কি?

মোহাম্মদ রফিক : আমি মনে করি,



কবির প্রচার কবিতা দিয়ে হোক। তুমি আজকে ভাবো যে, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, জীবনানন্দ দাশ, কতদিন টেলিভিশনে এসেছে?



শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক : তোমাকে আমি একটা কথা বলি,

তুমি যে সাহিত্যের জগতের অবক্ষয়ের কথা বললে এর মূল কারণ হচ্ছে মিডিয়া। তুমি একটা কবিতা, ধরো দীর্ঘকবিতা লিখলে, একটা গল্পের মতো তিন চার পৃষ্ঠা কবিতা লিখো, কোনো দৈনিক পত্রিকা এটা ছাপবে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ছাপানো সম্ভব না তো। তার তো সংবাদ দরকার। একুশ লাইনের বাইরে কবিতা ছাপা যায় না স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : তাহলে এরাই মূল ক্ষতি করছে। আমি মনে করি এখন কবিদের প্রথম উচিত, তোমাদের মতো তরুণ কবিদের, এইসব পত্রিকা টত্রিকাতে লিখা বন্ধ করে দেওয়া। নিজেদের প্রকাশ মাধ্যম তৈরি করা। তুমি পাঁচ টাকায় পারো, দশ টাকায় পারো বিকল্প মাধ্যম তৈরি করো। আমরা তখন সায়ীদ সাহেবের সেই পত্রিকায় অনেকেই লিখেছিলাম। উনার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব—মতের অমিল থাকা সত্ত্বেও তিনি কিন্তু আমাদের একত্রিত করেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি এই কথাটাই বলছিলাম।

মোহাম্মদ রফিক : সে যে আমাদেরকে খুব একটা দিক নির্দেশনা দিয়েছে তা না। কারণ সে সব সময় আমাকে বলতো যে, তিনি হচ্ছেন পুরোপুরি রোম্যান্টিক। আর আমি হচ্ছি সেখানে ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত। তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে আমাকে একি কথা বলেছেন, যে তোমার সাথে আমার ইয়ে নেই। আবার সে কিন্তু আমার ক্ল্যাসিক চর্চার প্রবন্ধ ছেপে কলকাতায় নিয়ে গেছে পত্রিকা। এটাই হচ্ছে তাঁর গুণ। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, মুখোমুখি বলেছিও এসব। তবে এই ব্যাপারটা ছিল, তিনি কিন্তু সবাইকে এক করেছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অন্য আরেক জনের মতামত সেটাকে তিনি গুরুত্ব দিতে জানেন।

মোহাম্মদ রফিক : হাঁ, জানেন। তারপর সে যখন রাজশাহী কলেজ ছাড়তে বাধ্য হলো, তার সাথে আমার রাজশাহী রেলে দেখা। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তুমিই না সেই লোক যে বোদলেয়ার পড়েছে? সে কিন্তু ঐ বিষয়টা আর তুলল না। সে তখন, তুমি চিন্তা করো, এটা কিন্তু তাঁর বিশাল হৃদয়ের পরিচয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, সিকান্দার আবু জাফরের কথাতো বললেন না।

মোহাম্মদ রফিক : সিকান্দার আবু জাফরের সাথে আমার, সিকান্দার ভাই তখন, মানে আমরা যখন এসেছি তখন তাঁর প্রায় শেষ দিনগুলি চলছে। হাসান আজিজুল হকের শকুন গল্পটা সমকালে ছাপা হয়েছিল। সেটা খুব আলোচিত তখন। হাসান তখন কলেজের মাস্টার। সে উৎসাহিত হয়ে আরেকটা গল্প লিখে পাঠাল। সিকান্দার আবু জাফর ঐ গল্পটা ছাপলেন না। হাসান তখন দুঃখে কষ্টে গল্পটা ছিঁড়ে পানিতে ভাসিয়ে দিল। এবং হাসান পরে বলেছিল, আমার এই গল্প যদি ছাপানো হতো তবে আমার উন্নতি আর হতো না। এই হচ্ছে সিকানদার আবু জাফর।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : গ্রেট।

মোহাম্মদ রফিক : আহসান হাবীবের সাথে সম্পাদক হিসেবে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। ওঁর সম্পর্কে বরং নির্মলেন্দু গুণ-রাই ভালো বলতে পারবেন। আবুল হাসান থাকলে বলতে পারত। কারণ ওদের লিখাই বেশি ছাপা হয়েছে। আমি দৈনিক পত্রিকায় প্রথম লিখেছি সংবাদে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সংবাদেই সবচেয়ে বেশি লিখেছেন।

মোহাম্মদ রফিক : এর কারণ হচ্ছে আবুল হাসনাত। তারপরে তুমি ধরো, আমি বহুদিন দৈনিক পত্রিকায় লিখি নি। কারণ মিডিয়ার প্রতি আমার আস্থা না থাকা। তারপরে ভোরের কাগজের জন্যে লিখেছি। আমার একটা লিখা নিয়ে ভোরের কাগজ ছাপল। তারপর ভোরের কাগজের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। সম্পর্ক দীর্ঘদিন ছিল সাবের (মইনুল আহসান) ও জাফর (আহমেদ রাশেদ) থাকা পর্যন্ত। তারপর কিছুদিন প্রথম আলোতেও লিখেছি। পরে সংবাদের সাথে যোগাযোগ আকারে-ইঙ্গিতে ছিল। মানে হাসনাত থাকতে যেরকম ছিল ওরকম না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, আপনার এখন যে জীবন যাপন, আপনি প্রচণ্ড উজ্জীবনের মধ্যে আছেন। এখন আপনার যাপনটা কেমন, স্যার? আপনি এখন সারাদিন একাই থাকেন?

মোহাম্মদ রফিক : আমি প্রথম রাত থেকে শুরু করি, রাত নয়টায় বিছানায় যাই, ভোর সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে উঠি। উঠে এক ঘণ্টার মধ্যে মুখটুখ ঠিক করা বা ঘর ঠিকঠাক করে আবার, ওষুধ পত্র সব গোছগাছ করে, আমি ঠিক পাঁচটার সময় বই খাতা নিয়ে লিখতে বসে যাই। এবং একভাবে আমি সাড়ে সাতটা পর্যন্ত লিখি।

তারপর আড়মোড়াটোড়া ভেঙ্গে পৌনে আটটায় উঠে যাই। আটটায় নাস্তা করি। নাস্তা করে একটু রেস্ট টেস্ট নিয়ে তারপর হাঁটতে যাই। হেঁটে ফিরে আসি, এসে স্নান করি, স্নান করে ধরো একটু হাল্কা নাস্তাটাস্তা করি আবার। করে আবার একটু বই পত্রটত্র পড়ি, দৈনিক কাগজটা দেখি, দেখে, তারপর আর সারাদিন ঐভাবে কাটাই, বসে থাকি। তারপরে যদি ইচ্ছে করে লিখি মানে লিখাটা এখন আমার মূল কাজ। তাগিদ বোধ করলাম তো লিখতে বসে গেলাম। সন্ধ্যার পর আর সেভাবে কাজ করতে চাই না। সন্ধ্যার পর আমি বসে থাকি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমরা তো স্যার অনেক কথা বার্তা বললাম। মোটামুটি যে জায়গাটা বাদ রইল, এই সময়ে যারা লিখছে স্যার, তাদের যে সব প্রবণতা গুলো আপনার ভালো লাগে, সেটা কিভাবে চিহ্নিত করেন?

মোহাম্মদ রফিক : প্রশ্নটা হচ্ছে, যে প্রবণতাটা আমার ভালো লাগল,

মানে আমি অবশ্যই চাই, আমার স্বপ্ন আরেক জনের ভেতর সফল হোক। হাঁ, সেটা আমি চাই। কিন্তু আমি মনে করি না যে, এটা ঠিক দৃষ্টি। আমার স্বপ্ন তো আরেকজন পূরণ করবে না। তাকে তার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে।

সুতরাং তাকে তার মতো করে লিখতে হবে। তবে আমি অবশ্যই আশা করব, তার লিখা পড়ে যেন মনে হয়, সে বিষয়টা জানে। এটাই তার ভুবন।  এই ভুবনটাকে সে তুলে আনছে। এই ভুবনটা তাকে এক জায়গায় পৌঁছে দেবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক : হাঁ, এটাই হচ্ছে আমার মূল কথা। আমি তোমাকে আবারও বলি যে,

আমি মনে করি, কাব্যের মুক্তি এবং মানুষের মুক্তি দুটো এক কথা নয়। সর্ব মানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না।

সুতরাং ঐ চিন্তা আমাদের আপাতত করে যাওয়া। অর্থাৎ সাধনা করে যাওয়া। মানুষকে উজ্জীবিত করে যাওয়া। যদি কোনোদিন সেই বিস্ময়কর ঘটনাটা ঘটে, হয়তো আরেকজন বঙ্গবন্ধু, হয়তো আরেক জনের নেতৃত্বের মধ্যে, বঙ্গবন্ধুর মতো সেই ঘটাবে। সেই দিনের আশায় বসে দিন গুণছি।

শ্রুতিলিখন সহায়তা : জব্বার আল নাঈম ও আমেনা তাওসিরাত

কবিকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র

এইচ/এসআই/বিআই/২৪ অক্টোবর, ২০১৬

ইনফো ডেস্কWriter: ইনফো ডেস্ক (1855 Posts)