একাত্তরের ফজর

71অবশেষে ললিতবাবু দীর্ঘনি:শ্বাস ছেড়ে বললেন,‘অনেক দিন হয়ে গেল তবুও এখনও যেন চোখের সামনে ভাসছে-চোখ বুজলে সব কিছু দেখতে পাই। মানুষের হিংসা লোভ ও অপরাজনীতির আগ্রাসী মনোভাবের সাথে পাল্লা দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা, ঘর বাড়ি খড়ের গাদা সহ সামনে যা পেল, সমানে ভষ্ম করতে শুরু করল। একদল চেনা জানা মানুষ গৃহস্থের আসবাব তৈজসপত্রসহ যাবতীয় সম্পদ, নির্দয় ভাবে লুঠে নেওয়ার মহোৎসবে মেতে উঠল। বাঁধা দেবার কোন প্রশ্নই ওঠে না বরং লুঠেরাদের জয়োল্লাসের আনন্দ ধ্বনি কানে পৌঁছাতেই, প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিক পারল ছুটে পালিয়ে গেলেন। আচমকা সামনে পড়ে গেলে লাঞ্ছিত হওয়াতো দূরের কথা ক্ষেত্র বিশেষে প্রাণ যাওয়াও অস্বাভাবিক ছিল না-লক্ষ লক্ষ মানুষ হারিয়েছেনও বটে! সব থেকে বড় সমস্যা ছিল যুবতী ও মহিলাদের নিয়ে। ময়লা কাপড় পড়িয়ে মুখে কালি লাগিয়ে বিকৃত করে আড়ালে রাখতে চেষ্টা করা হত, তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা স্বজনদের বুক ভেঙ্গে চুরমার করে দিত!!

সব কিছুর একটা শেষ থাকে কিন্তু লুঠেরাদের যেন এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছিল-কিছুতেই ছাড়ছিল না। বড় দলের পরে ছোট দল, তারপর ঝাড়– ঠিলে মালা কুড়াতে আর এক দল। লুকান কোন কিছু থেকে গেল কিনা, থাকলে তাদের সমূহ লোকসানের ভয়ে, সময় অ-সময় ছিল না। এক দল থাকতে আর একদল এসে উপস্থিত হত। ঘর দুয়ার থেকে আনাচ-কানাচ পর্যন্ত ঘুর-ঘুর করে বেড়াত আর সম্ভাব্য স্থানের মাটি খুঁড়ে গুপ্ত ধনের সন্ধান চালাত। চোখর সামনে বসত ঘর খুলে নিয়ে যেত। কম দামি ঘরে আগুন জ্বালিয়ে নৃসংশতাকে আরো বাড়িয়ে তুলত। লুটের এ মহোৎসবে পেটের খুধা মিটলেও চোখের খুধা তাদের কিছুতেই মিটছিল না।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত রাজা-বাদশাগণ সাম্রজ্যে বিস্তারের লক্ষে নতুন নতুন এলাকায় আক্রমন করে জনসাধারণকে হত্যা ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন ও নারীধর্ষণ করত-আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিত। সে কাজটি রাজ আদেশে সৈন্যরা করত। তারা কখনো নিজেদের দেশে এমন আচরণ করেছেন, জানা যায় না। সে সময়ে এটাকে রাজনীতির অংশ বলা হত। কিন্তু বর্তমানের সভ্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তার পুণরাবৃত্তি বিশেষ করে সৈনিকদের সাথে কিছু সাধারণ মানুষের সংশ্লিষ্ঠতা দেখে এটাকে কোন প্রকারে রাজনীতি বলা বলা যায় না। ‘গণ’ শব্দটিও এখানে চলে আসে। তবে কী রাজগণনীতি, না অন্য কিছু?

যাহোক, হাবুদের পাড়ায় লুঠ শুরু হতেই ওর বাবা অম্বিকাচরণ বাবু এক দৌঁড়ে গিয়ে পুকুর পাড়ে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়লেন!হঠাৎ উচ্চ কন্ঠের শব্দ কানে যেতে রাস্তার দিকে চোখ ফিরাতেই দেখলেন,মাঝবয়সি ছকা এক বস্তা ধান, কোন রকমে কোমর বাঁকা করে ধুঁকতে-ধুঁকতে নিয়ে চলেছে। বিপরীত দিক থেকে তার বড় ভাই এসে একেবারে যেন তার উপর হামলে পড়ল। ধাক্কা দিয়ে বস্তা ফেলে দিয়ে প্রশ্ন করল, শুধু ধান-না সোনাদানা টাকা পয়সাও কিছু আনিছিস? সন্তোষ জনক জবাব না পেয়ে নিজেই বলল, বাইরের লোকেরা সব দামি জিনিসপত্র হৈ-হৈ করে নিয়ে গেল। কদুর মত বোকাও একজোড়া নাদুস-নুদুস হালের বলদ ও একটি দুধেল গাই নিয়ে এসেছে, আহা-আহা, দেখলিও চোখ জুড়োইয়ে যায়, উঠোনটা যেন আলোয় আলোয় ভরে গেছে! আর তুই, সেই সকালে বারোইয়ে এক বস্তা ধান নিয়ে বাড়ি ফিরতিছিস! বোকা আর কারে কয়, মনে করিছিস, এ সুযোগ চিরকাল পাবি! হাঁ-করে দাঁড়াইয়ে না থাইয়ে যা-আবার যা, দেখ কিছু ভাল জিনিস পাস কিনা। বলি তোরা কি কোনদিন মানুষ হবিনে!

একাধিকবার লুঠ হয়ে যাবার পরে, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান একদিন দল-বল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। তার চরিত্র সম্পর্কে যাদের ধারণা ছিল তারা আগমনের আঁচ পেয়েই চুপি চুপি পালিয়ে গেলেন। আজকের আগমনের পিছনে যে শান্তির বারতা আছে তা ভীতু ও পলায়নপর লোকগুলো বুঝতে পারল না!অবশেষে খুঁজে পেতে কয়েক জনকে রায় বাড়ির পুড়ে যাওয়া ঘরের বৈঠক খানার আঙ্গিনায় জড়ো করা হল।অনেকেই শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের বানীতে আশ্বস্থ হলেন চোখ বুজে শান্তির পরিবেশ কল্পনা করলেন।কেউবা দাঁড়িয়ে থেকে এদের চরিত্রের আসল চেহারাটা স্মৃতির পর্দায় আর একবার দেখতে চেষ্টা করছিলেন।

কড়ে বরগা খুলে লুঠ হয়ে যাওয়া বড় বাবুর দালানের কাঠামোটা চেয়ারম্যান সাহেব দলবল নিয়ে পরিদর্শন করলেন। এ সুযোগে কানাই মাস্টার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড়মশাইকে চাপাস্বরে বললেন, লুঠকারি লেবারেরা কোন ছোট অথচ দামি জিনিস অবজ্ঞায় ফেলে গেছে কিনা, সাহেব তা যাচাই করতে গেছেন। সে যাই হোক কোন চেয়ার যোগাড় করতে না পারায় অবশেষে ভেঙ্গে পড়া ছাদের একটি টুকরো কয়েক জনে ধরাধরি এনে একখানা কাঠের টুকরো বসিয়ে যাদবের কাঁধে থাকা গামছাখানা বিছিয়ে দিয়ে কোন রকমে চেয়ারের বিকল্প তৈরী করা হল। বসবার ব্যবস্থায় গৃহস্থ্য খুশি না হলেও চেয়ারম্যান সাহেব খুশির সাথে উপবেশন করলেন।

উপস্থিত ভূক্ত ভোগীদের কাছে তাদের করুন অবস্থার কাহিনী জানলেন,লুঠেরা ও ধর্ষকদের এহেন হীন কদর্যতার খবর সময় মত জানতে না পারার জন্য দু:খ প্রকাশ করলেন। পাশা-পাশি আন্তরিকতার বহিপ্রকাশ হিসাবে একদা প্রাথমিক স্কুলের সহপাঠী ছোট বাবুকে ভর্ৎসনা করলেন। বললেন, আহা, একটা কাকের মুখেও যদি তুই আমাকে একটা খবর পাঠাতে পারতিস! যথা সময় খবর না পাওয়ার জন্য বার-বার দু:খ প্রকাশ করলেন। শান্থনা ও আশ্বাসের পরে হঠাৎ রাগে ক্ষোভে যেন ফুঁসে উঠলেন। যা ইচ্ছে উচ্চারণে লুঠেরাদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত অভদ্র ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় কিছুক্ষণ গালাগাল করলেন। ভাগ্যিস্ লুঠেরাদের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল না। তবে এত দুখেও হাসি সামলাতে না পেরে বোস মশায় টয়লেট ব্যবহারের ভান করে দূরে সরে গেলেন। বাকিদের অনেকের হৃদয়ে ঝড় চললেও মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে ব্যস্থ রইলেন।

মান মর্যদাসহ, ঘর ও বাইরের সব কিছু লুঠ হয়ে গেল কিন্তু খবর পাওয়া গেল শান্তিবাবুর নাদুস-নুদুস ষাঁড়টি লুঠ হবার পরিবর্তে যত্ন করে কেউ তাকে সমাজপতি ভট্টাচার্যি মশায়ের উঠানে স্বযত্নে বেঁধে রেখে গেছে! শুধু তা নয়-কিছু বিচলিও সামনে রেখে গেছে। অবলা ষাঁড়টি মহা আনন্দে জাবর কেটে চলছে। লুঠেরাদের এ ধরনের সৌজন্যমূলক আচরনে খোদ গৃহস্থ্য পর্যন্ত অবাক হয়ে গেলেন। কে একজন মন্তব্য করলেন,‘লুঠেরাদের মধ্যেও কৌলিন্য প্রথা আছে। দুর্বলেরা লুটের মাঠেও ছোট, তারা নিয়ে যাবার জন্য ধরেছিল বটে কিন্তু বড় কারোর নজর পড়ায়, ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

কাদি মাসী বারবার জোড়হাত কপালে ও বুকে ঠেকাতে ঠেকাতে বললেন,‘মালে ছেড়ে না গেলে এমনই হয়, নিয়ে গেলেও আবার হেঁটে ফিরে আসে। এটা ‘ধর্মের ষাঁড়’-লুট করার সাধ্য কারো নেই! কথা শেষ না হতেই হাত জোড় করা অবস্থায় ষাঁড়টির দিকে ফিরে অভ্যাস বশত আবারও নমষ্কার জানালেন। ষাঁড়তো বটেই কেউ অনুমান করতে পারলেন না যে, কার প্রতি তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন! পাশের থেকে একজন হেসে উঠলে পরেশের মা ধমক দিয়ে বললেন, ‘হাসির কি আছে,যদি ষাঁড়কেও নমষ্কার করে থাকে তাহলেই বা কী! বিপদের সময় শুধু ষাঁড় কেন তার থেকেও নগন্য অনেকেই নমষ্কার নয়-পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করতে হয়! কোন সময়ে যে আমজাদ এসে দলে যোগ দিয়েছিল কেউ খেয়াল করেনি। সে মন্তব্য করল, ‘এখন রেখে গেছে বটে কতক্ষণ থাকে দেখুন। একবার যখন চোখ পড়েছে,যার শক্তি বেশি, ঠিকই নিয়ে নেবে তবে আজ না হয় কাল। ষাঁড়তো আর উড়ে যাচ্ছে না।’

গোপাল তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল,‘আমার মনে হয়,এর মধ্যে একটা বিশেষ রহস্য লুকিয়ে রয়েছে।পালিয়ে থেকে দেখেছি কয়েক জন লোক খুব কসরত করে ষাঁড়টিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল,চলেও গিয়েছিল কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বেঁধে রেখে গেল।

ততদিনে গ্রামে অনেকেরই ঘর ছিল না। তবু যে কয়খানা তখনো হা-করে দাঁড়িয়ে ছিল, একদিন অতি যন্তে তার কপাট ও খিল লাগালেও কিছুদিন ধরে তার কোন ব্যবহার ছিল না! লুঠ শুরু হবার পর কেউ আর দরজা বন্দ করবার কোন দরকার মনে করতেন না বরং বন্ধ করলে ওদের সন্দেহ বেড়ে যেত।সন্ধ্যা হতেই গৃহস্থেরা সুযোগমত দরজায় শিকল টেনে,নিরাপদ স্থান বলতে বন-জঙ্গলে রাত কাটাতে যেতেন। বন্য জন্তু জানোয়ার,সাপ বিছার দল তা মেনে নিয়েছিল কিন্তু সামনে বর্ষাকাল,আর কতদিন এভাবে পালিয়ে বাঁচা যাবে!

চেয়ারম্যান সাহেবও খুব বিচলিত হয়ে পড়লেন। কয়েক দিন বাদে একটু মিঠে-কড়া সুরে  জানালেন, আপনারা বলছেন, আপনাদের ধর্মের জন্যই যদি এত গ্লানি, এত বিপত্তি তাহলে ওটাকে আর কেন বয়ে বেড়াচ্ছেন! আপনারা পন্ডিতেরাতো বলেন, ‘আগে প্রাণ পরে ধর্ম। আর সত্যি কথা বলতে কি, চারদিকে যা দেখছি বা শুনছি-ও সব সাবেকি ধর্ম এখন আর এদেশে চলবে না। আপনারা বরং ধর্ম ছাড়ুন, ঝুট ঝামেলা সব আমি দেখব।’ পাশে বসা বানরমুখো সাগরেদটি আর এক ধাপ উপরে উঠে বলল, ‘আপোষে না ছাড়লে আমরাতো আছি!’

শান্তি কমিটির সময়োচিত প্রস্তাব উপেক্ষা করার পরিবেশ ছিল না।বড় বাবুর কলেজ পড়–য়া ছেলেটা একটু গোঁয়ার প্রকৃতির,গর্জে উঠে কি যেন বলতে যাচ্ছিল,‘সব ধোকা ..। বাবুর ধমকে চুপ করে গেল। দিন তারিখ সব পাকা, ধর্ম ছাড়ার সিদ্ধান্তে ছাবু মুন্সি আনন্দে গদ-গদ হয়ে উঠলেন। তার বক্তব্যে মনে হল,যে দেশে শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায় বসবাস করে সেখানে কোন অশান্তি থাকে না-থাকতে পারে না। অনাগত শান্তির ফোয়ারায় তিনি আনন্দে আটখানা হয়ে পড়লেন।যাবার সময়ে নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিয়ে অবশেষে বললেন, ‘মেয়েদের ঘরের মধ্যে ছুড়ে দেওয়া কাপড় ছুঁয়ে উচ্চারণ করলে চলবে। এখনতো আর কোন ঝামেলাই রইল না, ওই বলা আর হওয়া একই কথা। এখন আমরা সব ভাই-ভাই হয়ে গেলাম।

একজন মুসলমান আর একজনকে সাহায্য করবে নাতো কে করবে! আমার কিন্তু তোমাদের সাহায্য একান্ত দরকার। আমি একা তরাপর বুড়ো মানুষ, কোন ঝুট ঝামেলা পছন্দ করি না। এ বয়সে কত দিক সামলাব বল দেখি! কৃষ্ণভক্ত সুরেন বাবু যদিও কয়েক দিন আগে গলার তুলসীমালা খুলে নিরাপদ ও পবিত্র স্থান মনে করে রেখে দিয়েছেন। সেই বাবুকে ডেকে মুন্সি সাহেব বললেন, তোমরা একটা কাজ করে রেখ ভাই, এত লোকের নাম রাখাতো আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি প্রত্যেকেই নিজের নামটা পছন্দ মাফিক রেখে নাও, খুব ভাল হয়, সময় বাঁচবে কাজেরও সুবিধে হবে।অষ্ফুট কন্ঠে বললেন, বিকেলে আবার দাসপাড়ায় প্রোগ্রাম আছে। আমার হয়েছে যত জ্বালা।যদি পার যেও-দাওয়াত রইল!

দু’দিন পরেই ষাঁড় বাঁধার রহস্য আবিষ্কার হয়ে গেল। এদিকে মানুষেরা অনিচ্ছায় হলেও আপোষ মিমাংশা করল বটে কিন্তু ষাঁড়টির ভবিতব্যের কোন পরিবর্তন ঘটল না! অনুষ্ঠানে একমাত্র তাকেই প্রাণ দিতে হল, আর মসলাদিসহ যাবতীয় খরচের যোগান দিলেন যাদের সকল অস্থাবর কোথাও স্থাবর সম্পদ ইতোমধ্যে অন্যের মালিকানায় চলে গেছে! পরিনামে এ গ্রামে আর হিন্দু বলতে কেউ রইলেন না!

এতদিন যারা ঘরের কপাট বন্ধ করতেন না, তারা ঘরে ফিরে এলেন। দরজায় আবার ভিতর খিল পড়তে শুরু করল কিন্তু দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ল না। শান্তি কমিটি শান্তির সঠিক পথ ধরিয়ে দিয়ে গেলেন বটে কিন্তু রাতের অতিথিরা একদম কথা মানলেন না! সুসময়ের নাগাল পেলে অনেকেই কথা রাখেন না শুনেছি, তবে কার কখন যে সুসময় তা আমরা জানি না! বুদ্ধিমানেরা ঠিকই বুঝে ফেললেন, শান্তি কমিটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দিনের বেলায়-ভর দুপুরে। রাতের দায়িত্ব তারা নেবেন কেন? তাছাড়া মুরব্বী না মানার ভুরিভুরি নজীর থাকাতে সম্ভবত শান্তি কমিটির নেতৃবৃন্দ বৃথা চেষ্টা করে, নিজেরা অসম্মানিত হতে চাননি। ফলে কথা দিয়েও মুরুবাবীরা ব্যর্থ হলেন!

ঘটনার শুরুতে গ্রামের যুবকেরা রাজ্জাকের নেতৃত্বে গর্জে উঠল। লুটেরাদের বাঁধা দিতে চেষ্টা করল কিন্তু বেশি দিনের জন্য নয়, তাদের দল টিকল না। অনেকে ইতোমধ্যে লাভ লোকসানের দিকটি বুঝে ফেলেছে।সত্যিই সুযোগ রোজ রোজ আসে না, ফলে দলে ফাটল ধরতে শুরু করল। কেউবা দিনে এক দলে এবং রাতে মুখোশ পরে ভিন্ন দলে যোগ দিলেন। কথায় আছে, “কাঁছা খুলতে দেরি আছেতো কপাল খুলতে নেই।” এক শ্রেনির সমাজপতি যারা প্রকাশ্যে চক্ষু লজ্বায় মাঠে নামতে পারেন না। তাছাড়া জন সেবায় ইতোমধ্যে অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন তাদের ঘরে সোনা, রূপা ও নগত টাকা যেন পায়ে হেঁটে যেতে শুরু করল। কেউবা মোটা অর্থের বিনিময়ে সাময়িক নিরাপত্তা দিতে বৃথা প্রয়াস পেলেন! কেউ কেউ ধর্মের নামে গচ্ছিত রাখলেন কিন্তু নিজ বাড়িতে ডাকাত পড়ায় পরবর্তীতে আর ফেরত দিতে পারলে না।!

নিজের প্রাণ বিপন্ন বুঝে রাজ্জাককেই একদিন আত্মগোপনে যেতে হল। যাবার আগে চুপি-চুপি বলে গেল, ‘জামানার এখনও শেষ হয়নি ভট্টাচার্যি মশায়। এমনই অভাগা যে,আপনাদের মান সম্মান, মালামাল কিছুই বাঁচাতে পারলাম না। মনে রাখবেন,আল্লাহ আছেন,তিনি কিছুতেই এ সব অন্যায় সহ্য করবেন না! এর বিচার একদিন হবেই-হবে! ওদের কথামত চলে জানগুলো বাঁচাতে পারেন কিনা দেখুন!যুদ্ধে যাচ্ছি, আশির্বাদ করুন যেন জয় নিয়ে ফিরতে পারি, নতুবা এই শেষ দেখা! আর বলতে পারল না ,যেমন ছুটে এসেছিল, চোখ মুছতে মুছতে তেমন হনহন করে বেরিয়ে গেল।

দিনবন্ধু কলেজে পড়াতেন, সৌখিন যাত্রাদলে অভিনয় করে এক সময় প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছেন। দাড়ি রেখে, বিশুদ্ধ উচ্চারনে কয়েকটি কালেমা মুখস্থ করে নিজের নাম রাখলেন দবিরুদ্দিন খান ওরফে দবির। মনে মনে ভাবলেন, আর কি, যথেষ্ট হয়েছে!

মুসলমান হওয়া আর মুসলমান সাজার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে,দবিরের মত অনেকে তা জানেন না। তাছাড়া ক্ষেত্র বিশেষে নতুনত্বের একটা ধাক্কা থাকে। নতুন টাকা পয়সা, নতুন যৌবনের প্রবাহে অনেকেই যেমন ভেসে চলেন তেমন দিনবন্ধুও নয়া মুসলমান হয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু বাড়াবাড়ি করতে শুরু করলেন। প্রকৃত মুসল-
মানেরাও ওর চাল-চলন দেখে অবাক হয়ে গেলেন!

একদিন পুরনো চাকর মদনকে নিয়ে শহরে রওনা হলেন।মদন কোনদিন মিলিটারি দেখেনি,শুনেছে তারা বিশ্বসেরা যোদ্ধা-হাতের টিপ নষ্ট হয় না!কোন প্রকারেই সাথে যেতে রাজি হচ্ছিল না।বাল্যবন্ধু খোকাও মিয়া বাঁধা দিলেন। তোর আবার শহরে যাবার দরকার কি!বাববার অনুরোধ করলেন,‘দিন কাল ভাল যাচ্ছে না,মাথাটা ঠান্ডা রাখ, যাস নে দিনু।

অবজ্ঞার ভঙ্গিতে দবির বললেন, ‘কি দিনু দিনু করছিস, আমি দবিরউদ্দিন খান। এমন বিশুদ্ধ কালেমা বাত্লাব যে, খোদ মিলিটারী কেন, ওদের বাপেরাও হা-হয়ে থাকবে! করুন কন্ঠে মদন আর্জি জানাল, ‘আমার না গেলে হয় না,বাবু ?’ দবিরউদ্দিন ধমকে উঠলেন,আবার ‘বাবু,’তোরা আমায় ডুবাবি দেখছি। চল, ভয়কি, আমিতো সাথে রয়েছি!

আত্মপ্রত্যয়ের কণ্ঠ কখনো কখনো অহঙ্কারের মত শোনায়।মানুষের মত ভগবানও বুঝি তেমন শুনলেন!মোড় ঘুরতেই রিক্সা দাঁড় করান হল। না, এরা কোন ভিন্ন ভাষার সামরিক জান্তা নয়, দেশীয় ভাই-একই আলো বাতাসে বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। বিশুদ্ধ কালেমা বাতলাবার কোন সময় পেলেন না। মুহূর্তে দু’জনকে দু’দিকে সরিয়ে নিল। নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে সন্ধ্যা নাগাদ মদন ফিরে এল কিন্তু বাবুর কোন হদিস বলতে পারল না। অনেক খোঁজাখুঁজি, দশ বারো মাইল দূরে ভাটায়, চরে আটকে থাকা লাসগুলির মধ্যেও সনাক্ত করা গেল না! আজও বাবুর কথা মনে করে মদন একা একা চোখের জল ফেলে!

শ্রোতার আসনে,নব প্রজন্মের প্রতীক তরুনেরা,প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধের কাছে তাদের প্রিয় মাতৃ ভূমির স্বাধীনতার গর্ভ যন্ত্রনার গল্প শুনছিল।এতক্ষণে একজন প্রশ্ন করল,মদন ফিরলেন কেমন করে,ওরা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল?

প্রবীণঃ হ্যাঁ,তবে ওরা নয়,সে এক কাকতলীয় ঘটনা! প্রথম কয়েক দিন মদন কিছুই গুছিয়ে বলতে পারেনি, কথার থেকে কেঁপেছে বেশি আর কেঁদেছে! পরে জানা গেল, লেখাপড়া জানত না বলে কোন কাগজ ফেলে দিত না, এমনকি বাবুদের বাজারের ফর্দ পর্যন্ত না। কোনটা কখন কোন দরকারে পড়ে, রেখে দিত থলের মধ্যে। হঠাৎ চেয়ারম্যান সাবেহের দেওয়া কাগজখানার কথা মনে পড়ল কিন্তু ভয়ে ততক্ষণে রঙটি ভুলে গেছে! ব্যস্থতায় থলের সব কিছু ওলট-পালট করেও মিলল না! হাত পা
অবশ হয়ে যাচ্ছে। এমন সময় বাঁশি বাজাতে বাজাতে কয়েকখানা মিলিটারির গাড়ি এসে হাজির হল। ঝটপট নামতেই, দেশিরা কুর্ণিশ করতে শুরু করল। আর কৌতুহলীর দল অদৃশ্য হয়ে গেল। সম্ভবত মেজর সাহেবের মেজাজ ভাল ছিল না অথবা ওদের কথিত বিচ্ছুর আক্রমনের তথ্য ছিল।

রাগত কন্ঠে মেজর সাহেব হাঁক ছাড়লেন, ‘সব হাট যাও, ইধার মে! ’মুহূর্তে সব ফাঁকা হয়ে গেল। যে মিলিটারীর নাম শুনলে এতদিন মদন পালিয়ে বাঁচবার কথা ভাবত সবার সাথে পালিয়ে যাবার সুযোগ থাকলেও সে এক পাও নড়তে পারল না। যে যার মত পালানোর সময় কি কেউ মদনের চলার শক্তিটুকুও যেন কেড়ে নিয়ে গেল! কিছু বুঝে না উঠতে পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় মদন ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকল। একজন সিপাহী বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে এল।পায়ের কাছে পড়ে থাকা কার্ডটি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হোতা হ্যয়”? ততক্ষণে মদনের গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে, কথা বলার শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই!কোন রকমে কাগজখানা কুড়িয়ে সাহেবের দিকে তুলে ধরতে গেল!

সিপাহীটি ব্যস্ততার সাথে বলল,‘ডান্ডিকার্ড? সাচ্চা মুসলিম,ঠিক হ্যায়,ভাগ যাও।’ মদন বুঝল,চলে যেতে বলেছে,সে আর দাঁড়াল না,ধীরে ধীরে জংলা পথে গ্রামের দিকে পা বাড়াল।কয়েক দিন পরে আসল কাগজটি পাওয়া গেলে জনার্ধন জানাল, মদন যে কার্ডটি দেখিয়েছিল সেটি আসলে রেশন কার্ড ছিল।

কখনো ’অতিকষ্টেও হাসি পায়! করুন হেসে জাফর সাহেব মন্তব্য করলেন,‘আই-ডেনটিটি কার্ডে একটি আর রেশন কার্ডে অনেকগুলি স্বাক্ষর থাকে, হয়তো বেশি স্বাক্ষর দেখে সিপাহী সাহেব বেশি মুগ্ধ হয়েছেন!

তারুন্যের প্রতিনিধি প্রশ্ন করল, একটি লোক দিন দুপুরে শহর থেকে হারিয়ে গেলেন অথচ তার আর সন্ধান পাওয়া গেল না, তখন দেশে কি কোন সরকার ছিলনা!
প্রবীণঃ ছিল বৈকি, তবে সাধারনের জন্য ছিল না! গুটি কয়েক শক্তির প্রতীকের সরকার ছিল।

তরুন:কোন সভ্য দেশে কি তা সম্ভব?
প্রবীণ:সবই সম্ভব,কারণ সভ্যতার সর্বজন স্বীকৃত সঙ্গা, অনেক সময় কোন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী মদগর্বে ভুলে যায়।পরিনাম যাই হোক,তাদের নিজেদের মতামতকে সর্বজন গ্রাহ্য করতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন।পাক সামরিক জান্তা তাদের যাবতীয় অমঙ্গলের হেতু ‘হিন্দু’ বলে জানত। ওদের আচরণ ও বক্তব্যে তার ভুরি ভুরি প্রমান রয়েছে। ওরা বলত,‘মালাউন কাঁহা-মুক্তি কাঁহা!’তাদের মতে,‘মুক্তি’ অর্থ ‘মালাউন’ আর ‘মালাউন’ অর্থ ‘মুক্তি’ অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা! আর ওদের মুখ থেকে কথা খসতে না খসতেই, দেশিয়রা বাস্তবায়নের জন্য বাংলা চষে বেড়াত! এমনকি ভোট না দেবার অপরাধে জনগনকে একহাত দেখিয়ে দিতে স্বাধীনতাকামি মুসলমানদেরও ‘মালাউন’ বলতে ওদের জিহ্বায় আটকায় নি। এ সুযোগে অনেকে ব্যাক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে এবং সম্পত্তির লোভে ওদের দলে যোগ দিয়ে যা ইচ্ছে করেছে, যা গল্প করে বলা যায় না।! দেখে শুনে মনে হত, লুঠ-তরাজ ডাকাতি হত্যা গুম ও ধর্ষণকে জায়েজ করে মানবতাকে বিপন্ন করতে পারলেই বুঝি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি রক্ষা পেয়ে যাবে! আইন কানুন, মানবিকতা, বিবেকের অনুশাসন মানতে গেলে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। ফলে নিয়ম নীতি সব উল্টে গেল!

তরুনঃ উল্টে গেল কেমন?
প্রবীণঃ জাতীয় নির্বাচনে পাকিস্তানিদের সমর্থকদের চরম পরাজয়ের গ্লানি ও অসন্মানের প্রতিশোধ নিতে নির্বাচিত বাঙালি প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জনগণের প্রত্যাখিত অনির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতার অংশ ছেড়ে দেওয়া হল। এমনকি যাবতীয় অন্যায়গুলি সংঘঠিত করল পবিত্র ধর্মের বানীকে উপেক্ষা করে, ধর্মের নামে-ধর্মীয় শ্লোগান দিয়ে। সে কারনেই শেষ পর্যন্ত, ধর্মও ওদের সহ্য করল না!

তরুনঃ তারপর!
প্রবীণ: তারপর, সময় প্রবাহমান, থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল না! বিদেশি হায়েনারা স্থানীয় স্বল্প সংক্ষক মানুষের সহযোগিতায় জনগণের উপর অত্যাচারের স্টীমরোলার চালাতে শুরু করল। তারাই রাতারাতি দেশপ্রেমিক ও আম জনতার ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে গেলেন। অবশিষ্ট জনগণকে বিচ্ছিন্নতাবাদী, নৈরাজ্যবাদী, ভারতের দালাল, ইসলামের শত্র, “দেশ-দ্রোহী, বিচ্চু মালাউন এমন আরো অনেক বিশেষনে বিভূষিত করলেন! পেত্নীসহ সাড়া গাছের ভূতের মত দু’টি পরাশক্তি মামদো ভূত, চেপে বসল জাতির ঘাড়ে। কাগুজে বাঘের পিছনে ফেউস্বরূপ সমস্বরে কণ্ঠ মিলাল দেশি বিদেশি বুদ্ধিজীবী ও ইয়েস ম্যানের দল! শিক্ষিত বাঙালি তাদের টাগের্টে পরিণত হল! মেধাশূণ্য প্রাণহীন পোড়া মাটি দখলে রাখার ঘোষণা দিয়ে, এক বালখিল্য প্রয়াসে মেতে উঠল ওরা!

তরুনঃ মেধা শূণ্য করবে কেন? ওরা কি মূর্খ ছিল, শিক্ষিত মানুষ পছন্দ করত না!
প্রবীণঃ হ্যাঁ, করত, ওদের দলেও অনেক শিক্ষিত ছিলেন। তবে সুযোগের বিনিময়ে পাল্টি খেতে অভ্যস্থ নয় এমন শিক্ষিত বাঙালি ওদের পছন্দ ছিল না।শিক্ষিত হলে সব কিছু বুঝতে শেখে, হিসাব দেখতে চায়।সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে চেষ্টা করে, স্বাধীনতার চেতনায় গড়ে ওঠে আর অন্যদের মধ্যে অনুপ্রাণিত করে, প্রতিবাদের ভাষা শেখায়। ক্রীতদাস বানিয়ে যা ইচ্ছে মিথ্যা তাদের বুঝান যায় না। আর বিপরীতদের ধর্মের দোহাই পেড়ে যৎ কিঞ্চিৎ সুযোগ সুবিধা ছড়িয়ে দিয়ে,মাথায় হাত বুলিয়ে শোষণ করা যায়। সে লক্ষ নিয়ে পাকিস্তানিরা সর্ব প্রথম বাঙালির চেতনা শক্তির উৎস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দৈহিক শক্তির আাঁধার রাজার বাগ পুলিশ সেন্টারে প্রথম আক্রমন চালাল। আর নিশ্চিত পরাজয় জেনে সর্বশেষ বুদ্ধিজীবী হত্যার পথ বেছে নিল। তাদের জানা ছিল, শিক্ষিত লোকদের মেরে ফেলতে পারলে, বাঙালি আর কোনদিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না!

তরুনঃ ওদের এদেশিয় দোসরেরাও বাঙালি, তারা ওদের বন্ধু হলেন কেমন করে?
প্রবীণ বললেন, ওটা বন্ধুত্ব নয়, রণকৌশল মাত্র। কুঠারে কাঠের হাতল ব্যবহার করে গাছ কাটতে হয়। তবে এখানে পার্থক্য হচ্ছে, হাতল তৈরীতে গাছ ইচ্ছা করে এগিয়ে
যায় না, জোর করে ব্যবহার করা হয় কিন্তু মানবরূপী হাতলের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন।বৃহৎ সমাজ থেকে কতিপয় মানুষ নিজেরাই হাতল হতে এগিয়ে যায়!জোয়ার ভাটার দিকে লক্ষ্য করলে দেখবে, ভাঁটার টানে জলরাশি একত্রিত হয়ে যখন সমূদ্রের দিকে ছুটে চলে, কোন বাঁধা মানে না।এ মন কি খাল বিল ডোবা নালার জলও সাময়িক বাসস্থান-
কে তুচ্ছ করে অগ্রবর্তী জলকে অনুসরণ করে,তখন প্রবল সে ভাঁটার স্রোতকে উপেক্ষা করে নদীর দু’পাশ ধরে সামান্য কিছু জল উল্টো দিকে ছুটে চলে। তেমন সিংহভাগ মানুষ ভাঁটার টানের মত ছুটলেও চিরকাল সামান্য কিছু মানুষ, স্বজাতির সাথে না ছুটে, গুটিগুটি পায়ে বিপরীত দিকে ছুটেছে। যারা ছোটে তাদের মনেও অজানা শঙ্খা থাকে। স্বজাতি সম্পর্কে নানা কটু কথা হজম করে,পদে পদে নিগ্রহ ভোগ করে,লঘু পাপে গুরুদণ্ড মাথা পেতে নেয়,তবুও তারা স্বজাতির সাথে থাকেনা!

কখনও কোন দিন, কোন বিদেশি রাজশক্তি ভালবেসে বা বিশ্বাস করে অন্যদের গ্রহণ করেনি, করেছে স্বার্থ হাসিলের জন্য। আবার কাজ শেষে বন্ধুকে মাথা থেকে ছুড়ে ফেলেছে পায়ের তলায়! তার ভুরি-ভুরি প্রমান আমাদের ইতিহাসে রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা বলে দেশ স্বাধীন না হলে পাকিস্তানিদের সমর্থক বাঙালি, সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক কেউ তাদের কাছে রেহাই পেতেন না।পাকিস্তানিরা তাদের একদিন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিত। প্রাগৈতিহাসিক দাসত্বের নেশার, জলন্ত প্রমান হিসাবে ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে রয়েছেন, মীর জাফর আলী খান ওরফে মীর জাফর!

তরুন: এ সব জেনেও শিক্ষিত বাঙালি পাকিস্তানিদের সাথে হাত মিলাল কেন?
প্রবীণ: এটা মানুষের চরিত্রের একটি দিক মাত্র।পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষতো কোন ছার,নাম করা বুদ্ধিজীবীরা শুধু মাত্র আরো অর্থ ও সুনামের লোভে এমন কাজ করে এসেছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কবি রবার্ট থ্রুষ্টকে দিয়ে একটি অর্ডারি কবিতা লিখিয়ে তার বন্ধনা করে পাঠের জন্য আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন।দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উল্থানে বেশি সহায়তা যুগিয়েছিলেন,ইউরোপের বুদ্ধিজীবী সমাজ।

তখনকার অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের অধ্যাপকেরা সোসালিজিম ও কম্যুনিজমের জোয়ার ঠেকাতে স্লোগান তুলেছিলেন,‘better dead than Red’ অর্থাৎ লাল বা কম্যুনিস্ট হওয়ার চেয়ে মরা ভাল। পাকিস্তানি আইয়ুবের আমলে সামরিক শাসনের সমর্থনে নাৎসি হিটরালের আদলে সরাসরি সরকারি অর্থায়নে ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একাংশ নিয়ে ‘রাইটার্স গিল্ড’ নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। পাশাপাশি ছিল ব্যুরো অব ন্যাশানাল রিকনস্ট্রাকশন নামে আর একটি সংস্থা। তখন অর্থ ও সুযোগ সুবিধা বিলিয়ে বুদ্ধিজীবী ক্রয়ের ফাঁদে এদেশের নামজাদা অনেক বুদ্ধিজীবী সানন্দে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৭১খ্রিস্টাব্দে গণহত্যার অন্যতম খল নায়ক রাও ফরমান আলী পাকিস্থানে প্রত্যাবর্তনের পর এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য তাকে লোক খুঁজতে হয়নি, রাইটার্স গিল্ডের বুদ্ধিজীবীরা অনায়াসে সে কাজটি সম্পন্ন করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করবার পরেও ইতিহাস বিকৃতির অনেক ঘটনা ঘটেছে। সবশেষে বলা যায়, এত কিছু করার পরেও এ দেশি দোসরদের চরম বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে পাক প্রভুরা আত্মসমর্পন করে নিজেদের প্রাণটা বাঁচিয়ে নিয়ে দেশে চলে গেলেন!!

তরুনঃ এ সব কথা ইতিহাসেও লেখা আছে, তাই না দাদু?
প্রবীণঃ হ্যাঁ, ইতিহাসে আছে তবে ইতিহাসের বাইরেও অসংখ্য ছোট বড় ঘটনা থেকে যায়। একটি উঁচু দালানের ছাদে উঠে নিশ্চয়ই সমগ্র শহরটিকে দেখা যায় না। যেটুকু দেখা যায়, তার সবটুকু লিখে প্রকাশ করা যায় না। একজন বা একদল মানুষ দীর্ঘ সময়ে একটি ইতিহাস তৈরী করেন, পন্ডিতেরা তা লিখে রাখেন। আবার একদল হলুদ ইতিহাসবিদ সে লেখার উপর কাঁচির মত কলম চালিয়ে বিকৃত করেন। তাই সব ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। যেটুকু পাওয়া যায় তা এক মাত্র শেষ কথা নয়, সমগ্র ঘটনার বিষয়বস্তু। তবুও ইতিহাস থেকে সত্য ও প্রকৃত ঘটনা খুঁজে বের করে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। প্রকৃত পাঠক ইতিহাস এবং ইতিহাসের অন্তরাল থেকে সত্য আহরণ করে থাকেন। ইতিহাস বর্হিভূত কাহিনী প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর হৃদয়ে লেখা থাকে। তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়, তারপর একদিন, মানুষ তথা সভ্যতার প্রতি ঘৃণা নিয়ে এক সময়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

তরুনঃ মানুষ প্রতিবাদ করে নি?
প্রবীনঃ অবশ্যই প্রতিবাদ করেছে শুধু প্রতিবাদ নয়, যুদ্ধ করে জয় ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু দাবী করার  মত সরকার তখন ছিল না-পরিবেশ ছিল না। মানুষ পরিবেশ সৃষ্টি করে, নিয়ন্ত্রণ করে আবার কখনও পরিবেশ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। কালবৈশাখীর ঝড় হঠাৎ রৌদ্রোজ্জ্ব¡ল আকাশ কালিমাখা মেঘে ছেয়ে ফেলে। মুহূর্তের তান্ডবে সব কিছু ওলট পালট করে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। মানুষের আত্মরক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা! পরিবেশ অনেকটা তেমন হয়ে উঠেছিল।
আর মানুষ,ছিল বৈকি! আমরা শুধু মানুষের বাইরের চেহারাটা দেখি ভিতরটা দেখতে পাই না। তাই চিনি বা জানি বলে কতই না দম্ভ করি। আসলে চেনা ও জানার ভিতর অসংখ্য ফাঁক থেকে যায়। আমরা সে টুকু মাঝে মধ্যে ভুলে যাই!সে সময়ে চেনা-জানা কাছের অ-নেক লোক হঠাৎ অচেনা হয়ে গেলেন! আর পরীক্ষীত মানুষেরা প্রত্যেকেই নানা ভাবে বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। কেউবা স্ব-স্ব চরিত্রানুসারে সুবিধামত দলে যোগ দিলেন, কেউবা উভয় দলের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চললেন। কিন্তু একমাত্র দেশপ্রেমিকেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে আত্মগোপন করতে বাধ্য হলেন। নিরীহ মানুষেরা পড়ে-পড়ে মার খেতে লাগল!

তরুনঃ প্রানের মায়া ত্যাগ করে যারা প্রতিরোধ যুদ্ধে গেলেন,তারা প্রকৃত দেশ প্রেমিক তাই না দাদু?
প্রবীণঃ হ্যাঁ,অবশ্যই তারা মহৎ প্রাণ ও দেশ প্রেমিক। জাতি বীর মুক্তি যোদ্ধাদের এবং স্বাধীনতা কামিদের চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

তরুন: বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তাদের প্রতি কিছু মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে দেখেছি। তবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারগুলি যখন আসেন তখন তাদের পোষাক ও চেহারা দেখে মনে হয়, তারা খুব অসহায় ও অস্বচ্ছল, এমনটি কেন হল, দাদু!
প্রবীন: এটাই স্বাভাবিক, দেশপ্রেমিক হতে বড় লোক হবার দরকার নেই। তবে যারা মাটির যত কাছাকাছি থাকেন তারা দেশকে তত বেশি ভালবাসেন। মাটিকে মায়ের মত ভালবাসেন। এদেশের সব থেকে বেশি সংখ্যক সাধারণ মানুষই দেশ মাতৃকার দুর্দিনে প্রতিরোধের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তারা অনেকেই বড়লোক ছিলেন না।আর সুযোগ হাতে পেয়েও তারা বড়লোক হতে চান নি।

তরুন: তবে মুক্তি যোদ্ধারা বিভিন্ন দলে ছড়িয়ে পড়লেন কিভাবে?
প্রবীণ: না ,মুক্তি যোদ্ধারা কখনও বিভক্ত ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও হতে পারবেন না। চেতনাগত ভাবে মুক্তি যোদ্ধারা কখনই বিভক্ত নয়। তবে একথা সত্যযে, তালিকা ভূক্ত মুক্তি যোদ্ধারা আজ বিভক্ত! গণদেবতারা বলেন, তালিকায় নাকি ভেজাল ঢুকে পড়েছে!

তরুন: তালিকায় ভেজাল কেমন?
প্রবীণ: নানা কারনে এ ভেজাল ঢুকে পড়েছে। যেমন ধর, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিকে পাকিস্থানি চেতনায় বিশ্বাসী ও তাদের সাহায্যকারি কিছু সুবিধাবাদি বুদ্ধিমান দু’নৌকায় পা রেখে চললেন, দূর থেকে স্বাধীনতার সূর্য উঁকি দিতেই বুঝতে পারলেন, পাকিস্তানের উপায় নেই, স্বাধীনতা কোন ভাবেই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তখন ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেকের মধ্যেই মুক্তি যোদ্ধা হওয়ার বাসনা জেগে ওঠে, আর সে সুযোগও তারা পেয়ে যান। কিছু সুখি ও শক্তিশালী মানুষ, যারা পবিত্র স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘গন্ডগোল’আখ্যায়িত করতেন এবং নিরাপদ দূরত্ব রাখতেন, তারাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন। আর এক দল তাত্ত্বিক আমাদের পবিত্র মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ আখায়িত করে বাঙালির অস্তিত্ত্বের দাবিকে অসম্মান করলেন এবং অন্য আর একদল ভারতে গিয়ে সেখানকার মাকড়সার জালের মত বিস্তৃত, বিনা ভাড়ার রেল পেয়ে ভূগোল সম্পর্কে যৎকিঞ্চিৎ প্রত্যক্ষ ধারণা গ্রহণ করতে মনের আনন্দে ভ্রমন করতে শুরু করলেন। এদের অনেকেই দেশ স্বাধীন হলে, ‘জয়বাংলা’ স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুললেন। আর একটি দল ঘরে বসেই বেনিয়াদের দৌলতে কাগুজে দলিল সংগ্রহ করে নিলেন।
নিন্দুকেরা বলে, স্বাধীনতার অনেক পরেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নতুন নতুন নাম সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে! এছাড়াও বাসস্থানের কারনেও অনেক চেতনা বিরোধী মুক্তির দলে যোগ দিতে বাধ্য হলেন। মোট কথা, ‘যে যে ভাবেই আসুন তারা সবাই আজ তালিকাভূক্ত কিন্তু তালিকাবদ্ধ সবাই স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী নয়।’

তরুন: তা হলে সব মুক্তি যোদ্ধা যুদ্ধ করেন নি?
প্রবীণ: দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতার চেতনাধারী প্রত্যেকটি মানুষ কেউ প্রত্যক্ষ আর কেউ পরোক্ষ ভাবে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। কেউবা প্রত্যক্ষ যুদ্ধে দু:সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, অনেকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদ হয়েছেন! তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আর অনেকে তাদের সহযোগিতা করেছেন।

তরুন: যুদ্ধ না করে কি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়?
প্রবীণ: অবশ্যই যায়। অস্ত্র হাতে না তুলেও নানা ভাবে যুদ্ধ করা যায়।গান গেয়ে, খবর প্রচার করে, চিকিৎসা দিয়ে, অর্থ সাহায্য করে,খাবার দিয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সে জন্য তাদের ভূমিকাও কম নয়।

তরুন: মুক্তিযুদ্ধতো সেই কবে উনিশ’শ একাত্তরে শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও মুক্তিযোদ্ধারা “একাত্তরের হাতিয়ায় গর্জে উঠুক আর এক বার”, ‘অস্ত্র জমা দিয়েছি কিন্তু ট্রেনিং জমা দেইনি’ইত্যাদি স্লোগান দেন কেন?
প্রবীণ:মুক্তিযুদ্ধ নিরন্তর,চলতেই থাকে এর কখনও শেষ হয় না। আর আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ মাত্র নয় মাসে শেষ হওয়ায় মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতি ফলন তেমন ঘটতে পারেনি।অনেকে ট্রেনিং নিয়েও যুদ্ধ করার সুযোগ পাননি। অন্যায় যুদ্ধের পরিনাম বুঝতে পেরে, পাকবাহিনী হঠাৎ করে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্ম সমর্পন করে নিজেদের প্রাণ বাঁচাল। যুদ্ধের প্রথম পর্ব অর্থাৎ জাতীয় যুদ্ধ শেষ হল বটে কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে,পাক দোসর,ঘরের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মানুষ বেশি সময় পায়নি। স্বাধীনতা এল, পবিত্র সংবিধান রচিত হল তবে সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার অর্থ বুঝতে পারল না! কোন সুস্থ, স্বাভাবিক প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ে উঠার আগেই জাতিও বন্ধু চিনতে ভুল করে বসল। এক দিকে ঘরশত্রু অন্য দিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। দলের মধ্যে বন্ধুরূপে লুকিয়ে থাকা শত্রুর দল, কিছু দিনের মধ্যে প্রমান করে দিল, ঘর শত্রু বিভীষন, বহিরাগত থেকে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে! স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান স্থপতি সহ স্বাধীনতার চেতনাধারীদের এক এক করে হত্যা করল!  আর সে সুযোগে শত্রুপক্ষ, স্বাধীনতার মহান মুক্তিযুদ্ধ’ কে বিতর্কীত করতে শুরু করল! তাই ‘পবিত্র মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘গন্ডগোলে’ বিশ্বাসীরা এখনও বিতর্ক করে  চলেছেন।

তরুনঃ প্রাত:স্মরণীয় মুক্তি যোদ্ধাদের তালিকায় ভেজাল ঢুকে কি প্রকৃত যোদ্ধাদের পবিত্রতা ও দেশ প্রেমিকদের অসম্মান করা হল না ?
প্রবীণঃ অসম্মান হয়, এ কথা সবাই জানেন, তবুও রাজনৈতিক দুর্বলতা, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে না পারায়, এমনটি ঘটতে পেরেছে।

তরুনঃ আচ্ছা দাদু, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়, না হয় তোমরা ভেজাল দিলে কিন্তু যারা স্বাধীনতার বিপরীতে সসস্ত্র ভূমিকা নিল, যাদের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় ও সাহসে এবং যারা প্রত্যক্ষভাবে লুঠ-তরাজ হত্যা, গুম, অগ্নি সংয়োগ ও নারীদের সম্মান হানি সহ যাবতীয় মানবাধিকার বাঁধাগ্রস্থ করতে উৎসবে মেতে উঠল, তাদের গ্রাম ভিত্তিক একটি জাতীয় তালিকা তৈরী করা হল না কেন? এ তালিকার বাইরের সবাইকে স্বাধীনতাকামি বলা যেত। আর দেশদ্রোহী তালিকাটিও একেবারে নির্ভেজাল হতে পারত কেননা কেউ আর গ্যাঁটের পয়সা খরচ দেশদ্রোহীর তালিকায় নিজের নাম লেখাতে চেষ্টাটি পর্যন্ত করতেন না?

প্রবীণঃ হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ কারণ ইতোমধ্যেই একাত্তরের অনেক স্বাধীনতা বিরোধী মানুষ ও তাদের পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম, স্বাধীনতা যুদ্ধে, তাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্ব ব্যঞ্জক ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে গর্ব করছেন। আর স্বাধীনতাকামী প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের গল্প শুনতে বাধ্য হচ্ছেন, এমন কি স্থান বিশেষে কেউ কেউ জয়ী দলের শুধু কর্মী নয়, নেতাও বনে গেছেন!

তরুন: পাক বাহিনী কি করল?
প্রবীণ: পাকিস্তানি মিলিটারি, দেশের সমর-নায়ক যারা একদিন দেশ ও জাতিকে প্রানের বিনিময়ে রক্ষা করার শপথ নিয়েছিলেন, মুহূর্তে সে বীরপুঙ্গবেরা নিজের দেশকে নিজেরা দখল করে ফেললেন! সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জনগনের অর্থে কেনা আগ্নেয়াস্ত্র শক্ত মুঠিতে চেপে ধরলেন, সেই জনগনের বুকে! সদম্ভে নিজের দেশের আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত দখল করে ফেললেন কিন্তু পারলেন না এদেশের মানুষের মন জয় করতে। ফলে ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ আর দু’লক্ষ মা বোনের সম্ম্রম কেড়ে নিয়ে পৈশাচিক হাসিতে নিজেরাই আত্মপ্রসাদ লাভ করলেন! সাবাস তাদের বীরত্ব!

তরুন: তবে, বাঙালিরাও কম যায় না। তাদের আত্মসমর্পনে বাধ্য করেছিল, তাই না, দাদু?
প্রবীণ: হ্যাঁ ওরা শুধু আত্মসমর্পন নয়, সাথে আরো নতুন ইতিহাসও সৃষ্টি করেছিল! অস্ত্র জমা দিয়ে, দু’হাত আকাশের দিকে তুলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে প্রমান করে দিয়ে গেল, ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, ঘরে গিয়ে মরব তবু রণক্ষেত্রে থাকব না।তাদের যুদ্ধবিদ্যার এ অভূতপূর্ব কৌশল ও বীরত্বগাঁথা পৃথিবীর সামরিক শক্তির ইতিহাসে কালো অক্ষরে অমর করে গেল!

তরুনেরা একসাথে আনন্দে লাফিয়ে উঠে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগনে মুখরিত করে তুলল!
মনে হল যেন একাত্তরে নয়, আজ এই মুহূর্তে তরুনেরা পাকিস্তানিদের সারেন্ডার করাল!

একজন তরুন বলে উঠল, বাংলার প্রত্যেক ইঞ্চি মাটি আমাদের কাছে পবিত্র হলেও, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যে স্থানটিতে হায়েনাদের অস্ত্র জমা দিয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছিলেন, সে জায়গাটি আমাদের কাছে মহা পবিত্র। সে মাটি আমরা ষ্পর্শ করতে চাই-আমাদের মাথা ঠেকাতে চাই! চল না দাদু, একদিন ঢাকায় গিয়ে সে জায়গাটিকে দেখে আসি!

প্রবীণ: দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে দাদু জবাব দিলেন, যে উদ্দেশ্যে তোমরা যেতে ”চাচ্ছ, তা এখানে বসেও করা যায়। এটাও বাংলার মাটি। যেখানে আত্ম সমর্পন করেছিল সে জায়গাটিতে আত্মসমর্পনের উল্লেখযোগ্য কোন তেমন কোন চিহ্ন রাখা যায়নি।

তরুন: তবে জায়গাটি কি ফাঁকা পড়ে আছে?
জবাবে প্রবীণ বললেন, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের মহা মূল্যবান জায়গা, ফাঁকা থাকতে পারে না। সেখানে নয়নাভিরাম শিশু পার্ক তৈরী করা হয়েছে!

তরুনের দল অবাক বিষ্ময়ে বক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা কোন প্রকারে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, এমন একটি বীরত্ব ব্যঞ্জক ঐতিহাসিক স্থানের মাহাত্ম কিভাবে আর একটি পবিত্র বিষয় দিয়ে ঢেকে রাখা যায়!

তরুন: আত্মসমর্পন করে ওরা নিশ্চয়ই কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেলেন।
প্রবীণ: না, প্রাণ বাঁচাতে ভারতের কাছে নিশ্চয়ই চেয়েছিল বটে কিন্তু বাঙালির কাছে আজ পর্যন্ত তারা ক্ষমা চায়নি। কৌশলে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়েছে মাত্র!

তরুন: কৌশল!
প্রবীণ: হ্যাঁ, কৌশলই বটে। তারা বুঝেছিল, ন্যায্য অধিকার চাওয়ার ফলে, বাঙালির উপর যে অন্যায় নির্যাতন চালিয়েছে তার কোন ক্ষমা হয় না। বাঙালির স্থানে তারা থাকলেও এর কোন ব্যত্যয় ঘটত না। আর স্বল্প সময়ে এবং অপ্রস্তুত, তাদের কথিত, ভেতো বিচ্চুদের হাতে যে মার খেয়েছিল তাতে বুঝেছিলে, এদের হাতে পড়লে আর কিছু না হোক, অন্তত পিঠের চামড়া থাকবে না। এ সব কথা বিবেচনা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মিত্র পক্ষের কাছে আত্মসমর্পন করল।

তরুন: পাক বাহিনীতে বাঙালি সদস্য ছিলেন না ?
প্রবীণ: ছিলেন, সংখ্যায় কম থাকলেও তার অধিকাংশ সদস্য বীরের মত স্বজাতির পক্ষে মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়ে জাতির শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, হাতে গোনা কতিপয় সৈনিক জাতির বিরূদ্ধে অবস্থান নিয়ে, পশ্চিম খন্ডে যুদ্ধরত ছিলেন এবং কেউবা যুদ্ধকালীন সময়ে ছুটিতে এসে আবার পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। কেউ কেউ দেশের মাটিতে থেকেও স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করছেন!

তরুনঃ তারপর ?
প্রবীনঃ তারপর, ধর্মের দোহাইতে যেমন পকিস্থান টিকল না, তেমন ধর্মান্তরীত হয়েও আমাদের প্রতি অত্যাচারের কোন পরিবর্তন হল না বরং মাত্রা তীব্রতর হতে থাকল! অতপর চৌদ্দপুরুষের ভষ্মীতুত ভদ্রাসন ছেড়ে অসহায় মানুষগুলো এক সময় দলে দলে অগস্ত্য যাত্রার কাফেলায় সরিক হতে থাকলেন।

তরুনঃ তারা কোথায় গেলেন?
প্রবীণ: প্রথমে যে যেদিক পারলেন, ছুটলেন। উদ্দেশ্য একটাই প্রিয় জন্মভূমি ছাড়তে হবে! প্রবল ঢেউয়ে নদীতে নৌকা ডুবে গেলে যেমন কেউ বসে থাকতে পারেন না, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও  অথৈ ঢেউয়ে ঝাপিয়ে পড়েন তেমন সাধারণ মানুষ, হিতাহিত শূণ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করতে লাগলেন! সাড়ে সাত কোটির এক কোটি লোক ভারতে শরনার্থী হলেন!

তরুন: পথে কোন সমস্যা হল না ?
প্রবীণ: নিজ জন্মভূমিতে যে বিপদের মধ্যে ছিলেন তার থেকে বড় কোন বিপদের ধারণা তখন কারো চিন্তার মধ্যে ছিল না।যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল ছিল, উপরন্তু রাজ পথগুলি ছিল হায়েনাদের দখলে। সুতরাং অধিকাংশ লোক পায়ে হেঁটে ও নৌকায় চড়ে রওনা হলেন। কত জন যে অনাহার ছুরি গুলি ও ধর্ষনে মারা গেছেন তার খোঁজ কেউ রাখে নি। দেশত্যাগী মানুষের কাফেলায়,ব্রাশ ফায়ারে ওরা মানুষ মারার উৎসব করেছে। তবে শিশু ও বৃদ্ধের অধিকাংশই ফিরে আসতে পারেনি। নাম জানা এবং না জানা জায়গায়,কোথাও সৎকার আবার কোথাও লাস ফেলে রেখে জীবীতেরা সামনের দিকে ছুটে চলতে বাধ্য হয়েছেন! মুহূর্ত বিলম্ব করে লাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে তারা চান নি!! হাঁটু কাদায় পথ চলতে কখনও পায়ের নিচে মানুষের লাশ পড়ে অন্যপ্রান্ত উঁচু হয়ে উঠেছে! উন্মুক্ত আকাশের নিচে মানুষের লাশ নিয়ে শিয়াল কুকুর ও শকুনদের টানাটানির দৃশ্য প্রায় নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় ছিল! ওদের কাছে মানুষ ও পাখি মারার মধ্যে কোন প্রভেদ ছিল না!

তরুন: মানুষ এভাবে চোখ উল্টাতে পারল?
প্রবীনঃ পারল বলেই, তখন থেকে দেশের মানুষ প্রধান দুটি দলে ভাগ হয়ে গেলেন, যে ধারা আজও বর্তমান। যারা প্রকাশ্যে কোন দলভূক্ত না হয়ে দু’দলের সাথেই সম্পর্ক
বজায় রেখে স্বাধীনতার পর হঠাৎ তারা দেশপ্রেমিক হয়ে উঠলেন। আর তাদের পদচারনায় স্বাধীনতার সমর্থকেরা ক্রমাগত বধির ও মুক হতে চলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা অবাক বিষ্ময়ে, নতুন করে আবার মানুষ চেনা শুরু করলেন। কিন্তু সে সময়ে আশ্চর্য করে দিল নেড়ি কুকুরের দল! তারা কিন্তু ভুল করল না। নুন খেয়েছিল তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা প্রভুর সাথী হতে চাইল। সাধ্যমত গৃহস্বামীর পিছনে ছুটে চলল। ভালবাসার শেষ বিন্দুটুকু ঢেলে দিতে চেষ্টা করল। পাষন্ড প্রভু নৌকায় বা কোন বাহনে চেপে যখন বললেন,‘আর মায়া বাড়াসনে, যা-চলে যা। সব কিছুর সাথে তোকেও আমরা ত্যাগ করলাম! আরো কি যেন বলতে গেলেন কিন্তু পারলেন না। চাপা কান্নায় কণ্ঠরোধ হয়ে গেল!গৃহিনী মুখে আঁচল টেনে ঘুরে বসলেন, ছোট বাচ্চারা হাউ-মাউ করে ডুকরে কেঁদে উঠল!

তরুনঃ কুকুর কি করল?
প্রবীনঃ কুকুর আর কি করবে, ওরা জানোয়ার, মানবেতর প্রানি। দীর্ঘদিন মানুষের কাছে থেকেও ওদের চরিত্র বদলাতে পারল না, সন্ধ্যা পর্যন্ত ঠায় অপেক্ষা করে ‘মানব চরিত্র’ সম্মন্ধে কোন ধারণা না পেয়ে অবশেষে কুকুরের ধর্ম পালন করল!তাই মাঝে মধ্যে কোন কোন ভষ্মীভূত বাস্তভিটায় প্রভুহারা কুকুরের মর্মভেদী করুন আর্তনাদ মানবতাকে কাঁদিয়ে যেত!

তরুনঃ কাঁদবার লোকও গ্রামে অবশিষ্ট ছিলেন?
প্রবীণঃ হ্যাঁ ছিলেন। সবাই গ্রাম ছাড়তে পারেন নি! এই বিশাল বিশ্বব্রম্মান্ডে যাদের যাবার কোন ঠাঁই ছিল না অথবা নিরুদ্দেশের উদ্দেশে পাড়ি দেবার মত সাহস ছিল না, একমাত্র তারাই দানব অধিকৃত গ্রামে চৌদ্দ পুরুষের ভিটে আঁকড়ে, কোন রকমে পড়ে রইলেন! কেউ কেউ বললেন, ‘দেশপ্রেম’।

তরুন: না পালিয়ে সবাই একসাথে রুখে দাাঁড়ান যেত না?
প্রবীণ: হ্যাঁ, রুখেই দাঁড়িয়েছিল। তবে ঘটনার আকষ্মিকতায় প্রথম দিকে আত্মরক্ষার গা ঢাকা দিতে হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পালাবার উদ্দেশ্যে নয়,সবাই পালান নি। ইতিহাস বলে, পালিয়ে কেউ কোনদিন বাঁচতে পারেন নি, অন্যকে বাঁচাতে পারেন নি। তাই, একাত্তরে বাঙালি আর পালাল না বরং বিশ্ববাসিকে দেখিয়ে দিল, সম্মিলিত প্রতিরোধে অত্যাচারির কালো হাত কিভাবে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে হয়।

তরুনঃ আমাদের গ্রামে কেউ কি ছিলেন?
প্রবীনঃ ছিলেন, তবে নিজ বাড়িতে পরবাসি হয়ে। ততদিনে অনেকের ঘর দুসকৃতি-কারিরা ভেঙ্গে নিয়ে গেছে, কম দামিটা পুড়িয়ে দিয়েছে আবার কোনটা দখল নিয়ে দিব্যি আরামে বসবাস শুরু করে দিয়েছে। প্রকৃত মালিকেরা, দিনের আলোয় নানা উপায়ে ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করে সন্ধ্যায় মাথা গুজতে ছুটতেন মাতৃআঁচল স্বরূপ সেই বন-বাদাড়ে।

তরুনঃ বনে-জঙ্গলে কেন?
প্রবীনঃ অপেক্ষাকৃত নিরাপদে রাত কাটাতে!

তরুনঃ মানুষ জঙ্গলে রাত কাটাত!
প্রবীনঃ হ্যাঁ, তখন জঙ্গলই মানুষের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান ছিল! মানুষ মানুষের বাসস্থান নষ্ট করলেও জঙ্গল বাসিন্দারা কিন্তু একবারের জন্য আপত্তিও তোলে নি বরং সহাবস্থান করেছে বা স্থান ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে!

তরুনঃ বনে-জঙ্গলে কোন আক্রমন হত না?
প্রবীনঃ সেখানেও আক্রমন হয়েছে, তবুও ঘরের থেকে নিরাপদ ছিল!

তরুনঃ সেখানে কেমন আক্রমন হত-দাদু।
প্রবীনঃ চৌষট্টি হাজার গ্রামের সর্বত্র একই রকম ঘটনা ঘটে নি, নানা ধরনের ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিহত করার মত কেউ ছিলেন না, কোথাও আবার প্রতিরোধের
ঘটনাও ঘটেছে।

তরুনঃ প্রতিরোধ কেমন?
প্রবীণঃ এক রাতের গল্প বলছি শোন, কোন এক জঙ্গলাকীর্ন ডোবার পাশে সেলিম নামে এক যুবক ও তার পরিবারের সদস্যেরা আশ্রয় নিল, আশেপাশে আরো অনেকে! কারো চোখে ঘুম ছিল না। তন্দ্রাচ্ছন্ন সেলিম স্মৃতি রোমন্থন করে চলছিল। স্মৃতিপটে বার বার ভেসে উঠছিল, ভুলে যেতে চাওয়া কিছু দৃশ্য। ভরদুপুরে একবাড়ি লোকের সামনে ছোট বোনটির অসহায় আর্তনাদের মুহূর্তে সে বারান্দার খুঁটির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল। আর অপর দিকে ভোট দেবার অপরাধে তার বাবার শরীরে দানবেরা, ওদের কথিত ‘লাঠিসিল’ মেরে রক্তাক্ত করছিল! কয়েক দিন যাবত বাবাকে খুঁজে পাচ্ছে না, কোথায় হারিয়ে গেলেন! কেউ বলছে, গুম করা হয়েছে। ডাকাতেরা বলছে, মুক্তি যুদ্ধে গেছেন!

হঠাৎ পায়ে বাঁধা সাংকেতিক রশিতে টান পড়ল, ‘বিপদ সংকেত’! ঝিঁঝি পোকাদের ডাক থেমে গেল, নিশ্চয়ই এদিকে আসছে! মুহূর্তে লোমক ’পগুলো খাড়া হয়ে শিড়দাড়া
বেয়ে কিসের একটা স্রোত মাথায় উঠে গেল! ভিতর থেকে কে যেন অনুক্ত স্বরে বলে উঠল, ‘শুয়োরের বাচ্চা-আজ তোর শেষ রাত’, ডান হাত ষ্পর্শ করল বল্লমের বাট, বাম হাত শক্ত মুঠিতে চেপে ধরল লম্বা গাছি দা। নি:শব্দে দু’পায়ের পাতায় ভর দিয়ে মেরুদণ্ড টুনির মত সোজা করে, একটু পিছনে বেঁকে গেল। ব্যস্, একবার নাগালে পেলে হয়, একেবারে এ ফোঁড় কি ওফোঁড়!
সংকেত চার দিকে পৌঁছে গেছে। ইতোমধ্যে সবুর, অমল, কবির দিনেশেরা চক্রব্যুহ রচনা করে ফেলেছে। চারদিকে পিন পতন নিরবতা, নিজের শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। আচম্কা সিংহগর্জনে যুবকেরা আগন্তুকের কাঁধে ঝাপিয়ে পড়ে ধরাশায়ী করে ফেলল, মুহূর্তে যোগ দিল অন্যরা। প্রতিরোধ দূরের কথা, মাত্র এক
বার ‘ফজরখা’ শব্দটি উচ্চারণ করে মস্ত বড় ডাকাত জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল!

তরুনঃ ‘ফজর খা কে?
প্রবীনঃ ‘ফজর খা’ ছিল এক কুখ্যাত ভয়ঙ্কর ডাকাত সর্দারের নাম! তার নামেই মানুষের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত! দেখেননি অনেকেই কিন্তু নাম শুনেছেন প্রত্যেকে! না দেখা লোকের গল্পে, আরো-আরো ভয়ানক হয়ে উঠত ফজর খার নির্মম পাষন্ডতা!

তরুনঃ তারপর?
প্রবীনঃ ‘ফজরখা’ শব্দটি কানে যেতেই জঙ্গলের নী:রবতা মুহূর্তে খান্ খ্না হয়ে গেল। ভয়ার্ত নারী পুরুষের সম্মিলীত আর্ত চিৎকার রাতের স্নিগ্ধ বাতাসকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিল। আর সে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে, এক জঙ্গল হতে আর এক জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, ‘ফজর খা আইছে,ফজর খা আইছে!’ ঝোপ জঙ্গল মাড়িয়ে কে কোন দিকে ছুটলেন, কিছুই আঁচ করা গেল না।

শুধুমাত্র গভীর রাতে অসহায় ভয়ার্ত একদল মানব সন্তান গগণ বিদারি চিৎকার চেচামেচি ও কান্নাকাটিতে  এলাকাটি সর-গরম করে তুলল। পায়ে-পায়ে জড়িয়ে অথবা ঝোপ-জঙ্গলে বাঁধা পেয়ে দুমদাম আছড়ে পড়ার শব্দ এক অনাকাঙ্খিত ভয়ঙ্কর পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলল! সুবল ময়রার দাওয়ায় বসে আজ বিকেলেই সুশীল বাবু দম্ভভরে গল্প করছিলেন, কবে কোথায় নাকি তিনি এক ডাকাতকে একাই ধরে এনে সবার সামনে ছুড়ে দিয়েছিলেন, দু’একটা ডাকাত এখনও তার কাছে নস্যি!’ সেই তিনি, সাপে ধরা ব্যঙের মত স্বস্থানেই নেতিয়ে পড়লেন, কোন সাড়া শব্দ করলেন না! বাতগ্রস্থ জলধর বাবুকে উদ্ধার করা হল, বিশ পঁচিশ মিটার দূরের এক ডোবা থেকে। শিয়ালের গর্তে আমূল সেঁধে গিয়ে ষাটোর্ধ বৃদ্ধা ক্ষেন্তমনি জোড়হাত করে কপালে ঠেকালেন। মা কালীর উদ্দেশ্যে জোড়া পাঠা মানত করে প্রার্থনা জানালেন, ‘রক্ষে কর, মা রক্ষে কালী, মান সম্মান বুঝি যায়!’

তরুনঃ ডাকাত ধরা পড়ার পর নিশ্চই আবার সবাই ফিরে এলেন?
প্রবীণঃ হ্যাঁ, এক এক করে প্রত্যেকে ফিরলেন বটে কিন্তু ফিরলেন না, একমাত্র লক্ষ্মীবাবু। অগত্যা সাহসী যুবকেরা খুঁজতে বের হয়ে পড়ল। নাম ধরে ডাকাডাকি করতে করতে ওরা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ল। জায়গা ছেড়ে একপা না নড়েও, অনেকে নানা উপদেশ দিতে লাগলেন।কেউ বললেন,খুব দূরে যেতে পারেনি, আশপাশটা ভাল করে খুঁজে দেখ।কেউ আবার মন্তব্য করলেন, কোথাও অজ্ঞান হয়ে পড়ে, নেই তো!
সবার জল্পনা কল্পনার অসারত্বকে একবারে ভেস্তে দিয়ে, ছেলেরা তাকে এনে হাজির করল। তিনি নাকি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, পাশের গ্রামের এক জঙ্গল থেকে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন। আগের কথা না বলাই শ্রেয় তবে উদ্ধার করারসময় নাকি জ্ঞান ছিল। গভীর বনে লতা পাতা ও কাঁটা গাছে জড়িয়ে এমন ভাবে আটকে পড়েছিলেন যে, প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। বন জঙ্গল কেটে তাকে উদ্ধার করতে আনতে হয়েছিল!

তরুনঃ অল্প সময়ে অত দূরে গেলেন, বাবু কি ভাল, দৌঁড়াতে পারতেন?
প্রবীণঃ দৌঁড় প্রতিযোগিতায় কোন দিন অংশ নিয়েছেন বলে শুনিনি। তবে বিপদে পড়লে অনুশীলন না থাকলেও অনেকে বড় রানার হতে পারেন। আর সম্ভবত ভয়ের, কাঁপুনির ঝাকুনিতে একটু একটু করে বনের গভীরে ঢুকে আটকে পড়েছিলেন!

তরুন: নিশ্চয়ই খুব ভয় পেয়েছিলেন।
প্রবীণ: পৌঁছাবার পরেও কিছুক্ষণ কেঁপেছেন কিন্তু ভয়ের কথা, তবে ভয় পাওয়ার কথা কখনো বলেননি। বরং নিরাপদ পরিবেশে ফজর খার অকস্মাৎ পতনের খবর জেনে হঠাৎ তার শরীরে বীররসের সঞ্চার হয়েছিল। কাঁটার আঘাতে সর্বাঙ্গ ছড়ে যাওয়া দেহে ছিন্ন পরিধেয় বস্ত্রের দুর্দশা দেখে অনেকেই দ্বিতীয়বার আর সেদিকে তাকালেন না। লক্ষ্মীবাবু কিন্তু কোন দিক ভ্রুক্ষেপ না করে আনমনে কাপড়ের দুর্দশা মোচন করতে করতে হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, ‘কোথায় হতভাগা-পাজি ফজর, সাহস তো কম নয় তোর কি প্রানের মায়াও নেই। একেবারে এ গ্রামে ঢুকে পড়েছিস্! এদিকে নিয়ে আয়,বদমায়েশটাকে দু’চার ঘা বসিয়ে দিয়ে হাতের একটু আরাম করি।’

তরুনঃ ডাকাতটার কি হোল, দাদু?
প্রবীণ বললেন, একটু পরেই হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল, ‘জ্ঞান ফিরছে-ডাকাতের জ্ঞান ফিরছে’! লোকজন আবার সেদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। জনার্ধন কোথা থেকে একটি আলো নিয়ে এলেন। ডাকাতের মুখে আলো পড়তেই ‘হায়-হায়’ করে চিৎকার করে  উঠলেন, তোরা কারে মেরেছিস, এ যে নিতাই।’
ততক্ষনে বাবুও নিতাইয়ের কাছা-কাছি পৌঁছে গেছেন। তবে বেশি কাছে না এগিয়ে দূর থেকে যাচাই করে নিতে চেষ্টা করলেন,সত্যি ফজর কিনা। অতপর নিশ্চিত হতেই তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মন্তব্য ছুড়ে দিলেন, ‘ আগেই জানতাম,ফজরকে ধরা কি অত সোজা! তোদের বীরত্ব ওই নিরীহ নিতাই পর্যন্ত।’

স্বত্ব ও দায় লেখকের…
Writer: মুখার্জী রবীন্দ্রনাথ (2 Posts)

প্রধান শিক্ষক, আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাগেরহাট।