বেগম রোকেয়া দিবস

Begum-Rokeyaবেগম রোকেয়া। পুরো নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্যের শেকড় উপড়ে ফেলে সমতা, উন্নয়ন এবং শান্তি অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী যে যুগের দাবি আমরা শুনতে পাই তা বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল তার লেখনীতে। তিনি সবসময় বালিকা বা কন্যাশিশুর অধিকারের কথা বলেছেন।

নারী জাগরণের পথিকৃৎ, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এই মহীয়সী ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম নেন।

তাঁর পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সম্ভ্রান্ত ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা, আর তিন ভাই যাদের একজন শৈশবে মারা যায়।

তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা অনুসারে রোকেয়া ও তার বোনদের ঘরে আরবি ও উর্দু শেখানো হয়। তবে বেগম রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের গোপনে রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে ঘরেই বাংলা ও ইংরেজি শেখান।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৮৯৬ সালে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়া পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নামেই পরিচিত।সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন উদারচেতা, মুক্তমনের মানুষ। তাই তিনি বেগম রোকেয়াকে লেখালেখি করতে উৎসাহ জুগিয়েছেন এবং সাহিত্যচর্চার সুযোগ করে দেন।

১৯০২ সালে বেগম রোকেয়া পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্পের মধ্য দিয়ে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন। ১৯০৯ সালে তার স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন মৃত্যুবরণ করেন।

স্বামীর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর ভাগলপুরে মেয়েদের জন্য সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরে অবশ্য ১৯১০ সালে পারিপার্শ্বিক কিছু সমস্যার কারণে স্কুল বন্ধ করে কলকাতায় চলে যান। ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল আবারও চালু করেন। স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত ছিলেন তিনি।

তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সমাজে নারীর উন্নয়নের জন্য প্রথমে দরকার কন্যাশিশুদের উন্নয়ন। তাই তার প্রতিটি লেখালেখিতে দেখা যায় নারীমুক্তির প্রতিফলন। বাংলার মুসলিম নারী জাগরণ, নারী উন্নয়ন ও নারী মুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়া পুরুষ শাসিত সমাজের নির্মম নিষ্ঠুরতা, অবিচারও কুসংস্কারে জর্জরিত অশিক্ষা ও পর্দার নামে অবরুদ্ধ জীবনযাপনে বাধ্য নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন।

Begum-Rokeya-1মুক্তির পথ দেখিয়েছেন উপমহাদেশের রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের নারীদের। তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই নারী সমাজ নীরব সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পারবে। নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি কখনো পুরুষকে ছোট করে দেখেননি।

তাই তিনি লিখেছিলন-

‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোড়াইয়া খোড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’ তিনি বুঝেছেন, প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষের সমতা অনস্বীকার্য। তিনি লিখেছেন, ‘দেহের দুটি চক্ষুস্বরূপ, মানুষের সবরকমের কাজকর্মের প্রয়োজনেই দুটি চক্ষুর গুরুত্ব সমান।’

নারী সমাজকে সচেতন করার জন্য তিনি আহ্বান করেছেন,

‘ভগিনীরা! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন, অগ্রসর হউন! মাথা ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল ভগিনী! আমরা আসবাব নই; বল কন্যে আমরা জড়োয়া অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্ধুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বলো আমরা মানুষ।’

১৯১৬ সালে বেগম রোকেয়া বিধবা নারীদের কর্মসংস্থান, দরিদ্র অসহায় বালিকাদের শিক্ষা, বিয়ের ব্যবস্থা, দুস্থ মহিলাদের কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ, নিরক্ষরদের অক্ষর জ্ঞানদান, বস্তিবাসী মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম মুসলিম মহিলা সমিতি ‘আন্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’

তিনি তার সাহসী লেখনীর মাধ্যমে নারী সমাজকে সংগঠিত করে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ডাকই দেননি, প্রস্তুত করার দায়িত্বও নিয়েছেন। তিনি নারী শিক্ষাকে কখনো পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের মাঝে দেখতে চান নি। তিনি শিক্ষার ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে, ‘আমি চাই সেই শিক্ষা যাহা তাহাদিগকে (নারীদের) নাগরিক অধিকার লাভে সক্ষম করিবে’।

অন্ন-বস্ত্রের জন্য নারী যেন কাহারো গলগ্রহ না হয় এটাই ছিল বেগম রোকেয়ার প্রত্যাশা। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন রাতারাতি কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে নারী সমাজ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষা। এ সত্যকে উপলব্ধি করে তিনি বলেছেন, ‘সমপ্রতি আমরা যে এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি ইহা অবরোধ থাকার জন্য হই নাই, শিক্ষার অভাবে হইয়াছি।’

তিনি তার রচনা দিয়ে ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচার রোধ করতে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন।

রচনা

তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা Sultana’s Dream। যার অনূদিত রূপের নাম সুলতানার স্বপ্ন। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলঃ পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর

উপমহাদেশের এই মহীয়সী নারী, সমাজ সংস্কারক, নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ১৯৩২ সালে এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করছি নারী সমাজের অগ্রদূত, কিংবদন্তী এই মহীয়সী নারীকে।

Inzamamul HaqueWriter: Inzamamul Haque (160 Posts)