নির্মাণ শেষের আগেই ভেঙে যাচ্ছে বাঁধ !

নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই ধসে যাচ্ছে বাগেরহাটের ভৈরব (দড়াটানা) নদী তীর প্রতিরক্ষা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৫/৩ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ মেরামত কাজ।

Bagerhat-35-3Polder-Pic-02নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার আর চুক্তি আনুযায়ী কাজ না হওয়া তেই এমন বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের নোনা পানি থেকে বাগেরহাট জেলা সদরসহ কয়েকটি এলাকার লক্ষাধিক মানুষকে রক্ষায় আঁশির দশকে শেষ ভাগে বাংলাদেশ পানি উন্নয় বোর্ডের (পাউবো) অধিনে নির্মান করা হয় ৩৫/৩ পোল্ডার। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই পোল্ডারের ভৈরব (দড়াটানা) নদী তীদের রাধাবল্লভ, পঞ্চমালা অংশে মারাত্মক ভাঙন দেখা দেয়। ফলে ঝুকিতে পড়ে পাউবোর (ওয়াপদার) এই বেড়িবাঁধটি।

বছর বছর বর্ষা মৌসুমে নদীর এই অংশে প্রকট হচ্ছিল ভাঙন। ফলে পাউবোর পোল্লারটির সাথে জোয়ারের সময় ভেষে যাচ্ছিল এই এলাকার হাজারও মানুষের ফসল, মাছের ঘের ও বসত বাড়ি।

অব্যহত এই ভাঙন আর বর্ষার জোয়ারে পানি থেকে রক্ষায় ২০১৪ সালে অক্টবরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পোল্ডারে এই অংশে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জান গেছে, বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রকল্পের আওতায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৩৫/৩ পোল্ডারে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্যাকেজে পানি উন্নয়ন বোর্ড গত ২০১০-১১ অর্থ বছরে দরপত্র আহ্বান করে। চলতি অর্থ বছরে বিশ্বব্যাংক এই পোল্ডারের ৩৭৫ মিটার ব্লক এবং প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার নদীর তীর প্রতিরক্ষার জন্য ৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়।

কিন্তু ব্লক ফেলে বেড়িবাঁধের ৩৭৫ মিটার এলকা সুরক্ষার পুরো কাজ শেষের আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে ধসে পড়ছে ব্লক।

সরেজমিনে বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ভৈরব (দড়াটানা) নদী তীরে রাধাবল্লভ এলকায় সদ্য ব্লক ফেলা বাঁধের ৩৭৫ মিটারের অন্তত তিনটি স্থানে দেবে গেছে। দেখা দিয়েছে ধ্বসেরও।

ইউনিয়নের রাধাবল্লভ, পঞ্চমালা, খেগড়াঘাট, মাদারদিয়া বাঁশবাড়িয়াসহ কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষের বসবাস এই ভৈরব নদী তীরে। বাঁধের পাশে বিস্তুীর্ণ এলাকায় রয়েছে তাদের মাছের ঘের, ফসলি জমি ও বসতঘর। আর এ বাঁধকেই রাস্তা হিসাবে ব্যবহার করেন এ এলাকার মানুষ।

তাই আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই বাঁধের নির্মানকাজ শেষ করার দবি ছিলো স্থানীয়দের। কিন্তু নির্মানের ১৫ দিনের মাথায় ধ্বসে যাওয়ায় ক্ষোভে ফুসে উঠেছেন সাধারন মানুষ।

তৈরি শেষ না হতেই যদি ভেঙে যায় বাঁধ তবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে কি হবে এমন প্রশ্ন এই এলকার মানুষের মনে। তাদের দাবি আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই বাঁধটি পুননির্মাণ করা হোক।

Bagerhat-35-3Polder-Pic-01ভৈরব নদী তীরের পঞ্চমালা গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান রাসেল নকিব। বাগেরহাট শহরের বাসাবাটি স্কুলের ৬ষ্ঠ শেণীর ছাত্র সে। শনিবার দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে সে বলেন, আমাদের স্কুলে যাওয়ার এক মাত্র রাস্তা এই বাঁধ। এই পথেই আমার যাতায়েত করি। প্রতি বছর বর্ষায় ভাঙনের কারনে এই এলাকা পানিতে ডুবে যায়। তখন আমরা স্কুলে যেতে পারি না।

বাঁধ সংলগ্ন জমির ঘের মালিক মো. রেজাউল শেখ টিপু বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে জানান, গত ৪/৫ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে বাঁধের এই অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে জোয়ারে সময় পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ফসল, মৎস ঘের, বসত বাড়ি।

‘বার বার এই ওয়াপদা ভেঙে যায়, জমি ওয়ালাদের জমি দিতে হয়। তাই দির্ঘ্য দিন ধরে এখানে স্থায়ী ভাবে বাঁধ নির্মানের দাবি ছিলো। টেন্ডার হইছে। কাজের মান ভালো হবে কিন্তু কাজ ভালো হয়নি। ভিতরে পাথর ফেলানো কথা পাথরও ফেলাই নি। তাই তৈরির আগেরই ভেঙে যাচ্ছে বাঁধ।’

রাধাবল্লভ এলাকার কৃষক হারুণ শেখ (৫০) জানান, এই বাঁধের পাড়েই কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ৫/৬টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। ভাঙনের ফলে বছর বছর নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে আমাদের জমি। বাঁধ না হলে বর্ষায় এই এলকা পানি বন্দি হয়ে যাবে। গত বছরও পানি বন্দি থাকায় এই এলাকার মানুষ ঈদের নামাজ পড়তে পারেনি। খেয়ে না খেয়ে থকাতে হয়েছে।

কিন্তু বাঁধ হলেও কাজ ভালো না হওয়ায় এখনই তা ধ্বসে যাচ্ছে। এই শুকনো মৌসুমে এই অবস্থা হলে বর্ষার ভরা জোয়ারে বাঁধ টিকবে কিভানে এমন প্রশ্ন তার।

বাঁশবাড়িয়া এলাকার কৃষক আলম শেখ বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে বলেন, এখানে ১০/১৫ দিন আগে এই ওয়াবদায় ব্লক দেওয়া শেষ হইছে। মাটি দিয়ে বাঁধ ঠিক করে তার পর ব্লক ফেলার কথা থাকলেও বালি দিয়ে তারা জায়গা সমান করছে। তাই এখনই ধ্বসে যাচ্ছে।

বাঁধ ঠিক না হলে এবারও বর্ষায় আমাদের ডুবতি হবে। লক্ষ লক্ষ টাকার চিংড়ি ও সাদা মাছের ঘের ডুবে যাবে।

স্থানীয় ঘের মালিক শফিকুল ইসলাম (৩৮) বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে জানান, প্রথমে মাটি দিয়ে বাঁধ ঠিক করার কথা থাকলেও তা করেনি ঠিকাদার। তারা বালি ফেলে তার উপর ব্লক বসিয়েছে। নদীতে পাথার ফেলার কথা ছিলো তাও কারে নি। তাই এখনই ভাঙন দেখা দিয়ে। এই বাঁধ টেকবে না।

তিনি প্রশ্ন করেন, আপনারা তো ভাঙন ঠেকাতি বাঁধ দিচ্ছে, তা হলে এখন এই বাঁধ ঠেকাবে কি ভাবে?

তবে নির্মাণ কাজ শেষের পোঁনের-কুড় দিন না পেরুতেই বাঁধের বিভিন্ন এলকা ধ্বসে যাবার বিষয়টি মানতে নারাজ পাউবোর (পানি উন্নয় বোর্ড) কর্মকর্তারা।

এব্যাপারে জানতে বাগেরহাটে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইন উদ্দিন বাগেরহাট ইনফো ডটকমকে বলেন, ‘কাজটি মূূলত ওয়ার্ড ব্যাংকের কাজ। ওখানে এক কিলোমিটার কাজ করার কথা। এটি পিস মিল কাজ। পিস মিল কাজ আসলে টেকসই হয় না। ওখানে ডাম্পিংয়ের কাজ এখনও শেষ হয়নি।’

তিনি জানান, এটি আসলে ধ্বস ঠিক না। ঠিকাদার আসলে ঠিক মতোন প্লেসিং করতে পারে নি। ধসে যাওয়া স্থান মেরামতের জন্য তারা ঠিকাদারকে চিঠি দিয়েছেন।

কাজ বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠন এইচ সি এল এস আরকে কোন বিল পরিশোধ করা হবে না উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ওই কাজ আমরা এখনও গ্রহণ করিনি এবং করব না। আপনাকে আাশস্ত করছি ওই কাজ শেষ না করে তাদের (ঠিকাদার) কোন বিল পরিশোধ করা হবে না।

১৬ মার্চ ২০১৫ :: অলীপ ঘটক ও ইনজামামুল হক,
বাগেরহাট ইনফো ডটকম।।
এস/আই হক-এনআরএ/বিআই
ইনফো ডেস্কWriter: ইনফো ডেস্ক (1855 Posts)