আবৃত্তির কথা এবং আবৃত্তি (পর্ব-১)

নাজমুল আহসান

Nazmul Ahsanশিল্পী কাজ করেন রং দিয়ে, আর কবি শব্দ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন সেই কাজ। কবিতাকে কেউ বলেছেন মিউজিকাল থ্রটস; কেউ বলেছেন, কল্পনার অভিব্যক্তিই কবিতা। জীবনের সত্য ও সৌন্দর্যের জীবনোপলদ্ধিই কবিতায় রূপ নেয়। সেই কবিতাকেই আশ্রয় করে অনুশীলনের গভীর স্পর্শে অবয়ব মেলে ধরে আবৃত্তি। কবি যেমন বিশেষ আবেগ, চিত্রকল্প, গল্প প্ররিস্ফুটন ঘটান কবিতার মাধ্যমে আর আবৃত্তিকার কন্ঠের সুসামঞ্জস্য পরিকল্পনায় যথাযথ আবেগ, প্রমিত উচ্চারনের দ্যেতানায় রঙিয়ে তোলেন প্রতিটি শব্দকে। শ্রোতাকে করে  রাখেন শব্দের মায়ার জালে আচ্ছন্ন।

সংস্কৃত রসসাহিত্যের বোদ্ধারা আবৃত্তিকে বহুবিধ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছেন; বলেছেন, ‘আবৃত্তি সর্বশাস্ত্রানং বোধাদপি গরিয়সী’।



‘আবৃত্তির অভিধানগত অর্থ যা মেলে তা হচ্ছে, বারবার পড়া বা পুনঃ পুনঃ পাঠ। আবৃত্তিকার যদি পুনঃ পুনঃ পাঠ করে যান তবে আভিধানিক অর্থে সেটাই আবৃত্তি। আভিধানিক অর্থ সংযোগে শিল্পসম্মতভাবে নন্দনতাত্ত্বিক বোধসম্পন্ন সৃজনশীল পরিমিতিবোধে পাঠ করাকে আবৃত্তি বলে।’


কবিতার ক্লাস বইয়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি তার পরিশীলিত কন্ঠের ওঠানামা, সুস্পষ্ট ও অর্থবহ উচ্চারণে, ছন্দের সৌন্দর্যে, কবিতা বা গদ্যের ভাব ও আনুগত্য স্বীকার করে, কবিতা বা গদ্য সম্পর্কে নিজস্ব আবেগ অনুভূতি অভিজ্ঞতা দিয়ে যে মায়াময় কন্ঠস্বর তৈরী করেন তাই আবৃত্তি।’



আবৃত্তি হচ্ছে শিল্পীর স্মৃতির ধারাবাহিক সবাক চিত্র। শিল্পী যে কাজ করেন রঙ দিয়ে, কবি যে কাজ করেন শব্দ দিয়ে, আবৃত্তিশিল্পী সে কাজ করেন কন্ঠস্বর দিয়ে। আবৃত্তিকারের নিজস্ব আবেগ, অনুভব, মেধা, মনন, বোধ ইত্যাদির সমন্বিত প্রয়োগে উচ্চারণের বিশুদ্ধতা রক্ষা করে কবিতার অন্তর্নিহিত মর্মার্থের বাচিক উপস্থাপনাই হচ্ছে আবৃত্তি।

অন্যভাবেও আবৃত্তিকে সংঞ্জায়িত করেছেন সংস্কৃতি বিশারদগণ, সাহিত্য পদবাচ্যের (কবিতা এবং গদ্য) সামগ্রিক রূপকে কন্ঠস্বরে যথাযথ প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভাষায় প্রমিত উচ্চারণ অক্ষুন্ন রেখে ধারণকৃত অনুভূতি, আবেগ, ভাব, গতি, বিরাম, ছন্দ ইত্যাদির সমন্বিত ও ব্যঞ্জনার প্রকাশই আবৃত্তি।

আবৃত্তি এবং অভিনয় কি একে অপরের পরিপূরক, অভিন্ন কিংবা সাযুস্যপূর্ণ, সে প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আবৃত্তি আর অভিনয় দুটো স্বতন্ত্র শিল্প। কিন্তুু দেখছি অনেকে দুটোকেই অভিন্ন মনে করেন। তাই গলা কাঁপিয়ে এবং হাত-পা নেড়ে আস্ফালন করাকে তাঁরা আবৃত্তি বলে চালিয়ে দেন। আবৃত্তি বাচনিক শিল্প, অভিনয় আনুষ্ঠানিক শিল্প। আকারে সহধর্মিতা থাকলেও প্রকারভেদ রয়েছে দুটোর মধ্যে।’

আবৃত্তিশিল্পী আশরাফুল আলম আবৃত্তির সংজ্ঞা নিয়ে বলেন ‘শ্রোতার বুদ্ধিবৃত্তি ও আবেগের নিকট বক্তব্যসহ কবিতার সামগ্রিক রূপকে কন্ঠস্বরের মাধ্যমে সঞ্চারিত করার জন্য শুদ্ধ উচ্চারণে শ্রবণযোগ্য পাঠের দ্বারা কবিতার বিধিত অর্থ, ভাব, ছন্দ, যতি, গতি, দোলা ইত্যাদির সমন্বিত ব্যাঞ্জনা প্রকাশই আবৃত্তি।’

আবৃত্তি একটি বহমান চর্চা। সতত অনুশীলনই একজন আবৃত্তিকারকে প্রতিদিনই করোটিতে নতুন নতুন উপলদ্ধি সৃষ্টিতে সহায়তা করে, কবিতার গভীরে নিজেকে প্রোথিত করার প্রেরণা দেয়, নতুন বোধ আর সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটায়-কন্ঠস্বরকে শাণিত করে নিজেকে গড়ে তোলে হৃদ্ধ আবৃত্তিকার হিসাবে।

যে কোন শিল্পের চর্চায় প্রাচীনত্ব এবং গুরুত্ব স্বীকৃত। একজন পাঠক নিজস্ব বোধের আলোয় কবিতাকে উপলদ্ধি করতে পারেন। আবৃত্তিকারকে তাই প্রথমেই বুঝে নিতে হয় কবিতাটি। শ্রোতার কাছে কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে শ্রবণযোগ্য শিল্পকলার দ্যোতনায় প্রতিষ্ঠা করেন একজন আবৃত্তিকার। তাই আবৃত্তিকারকে নিতে হয় নানা প্রস্তুতি এবং স্বরপ্রক্ষেপণের নানান কৌশল। অনুশীলনই পারে সেই জায়গায় পৌঁছে দিতে। সে জন্য একজন নতুন আবৃত্তিকারের অনুশীলনে শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ, কবিতার ছন্দ, মাত্রা, পর্ব, লয়, গতি, যতি ও বিরাম চিহ্ন, কবিতার রস, গুন সম্পর্কে জানা, বাক্যের ভাবানুযায়ী স্বক্ষেপণের পরিকল্পনা করা এবং কন্ঠস্বর, বাকযন্ত্র ও দম এর নিয়মিত অনুশীলন অত্যন্ত আবশ্যক।

সামগ্রিকভাবে এই কাজগুলো নির্ভর করছে একজন আবৃত্তিকারের আন্তরিকতার উপর। তিনি যদি তার আবৃত্তিকে শিল্পের সম্মান দিতে চান তাহলে ঐ কাজগুলোর কোন বিকল্প নেই।

[বাকি অংশ পড়ুন আগামী পর্বে…]

লেখক: আবৃত্তিকার।
e-mail: nazmulnewage@gmail.com
জেএইচ/এসআইএইচ/বিআই/১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
Nazmul AhsanWriter: Nazmul Ahsan (7 Posts)