আবৃত্তির কথা এবং আবৃত্তি (পর্ব-২)

নাজমুল আহসান

Nazmul Ahsan[পূর্ব প্রকাশের পর] ২.
প্রমিত উচ্চারণ :
শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ জানা, সুন্দর বাচনভঙ্গিতে কথা বলা, বাংলা ভাষার মাধুর্য্যকে উপলদ্ধি করা, ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষা করা এগুলো যেমন জরুরী তেমনি ভাবে আবৃত্তিকারের মর্যাদার প্রাথমিক শর্তও হচ্ছে এগুলিই। আবৃত্তির সাথে যা ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

প্রতিটি ধ্বনি উচ্চারণের জন্য মুখ, দাঁত, জিহ্বা, ঠোঁট ব্যবহার করা হয়। সব সময় কানকে সজাগ রাখা দরকার, জিহ্বাকে সচেষ্ট রাখা প্রয়োজন যেন প্রতিটি শব্দ, ধ্বনি সঠিক ভাবে উচ্চারিত হয়। আবৃত্তিকারের জন্য সুস্পষ্ট উচ্চারণ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ, অর্থ, ভাব ও সৌন্দর্য, আবেগ সঞ্চারিত করার মতো উচ্চারণ অত্যন্ত জরুরী। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলি অর্জনের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন এবং সজাগ দৃষ্টি, সার্বক্ষণিক প্রয়োগে রপ্ত করা। প্রয়োজন বর্নমালার প্রতিটি স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ কৌশল আয়ত্ব করা। প্রমিত বাংলা শুদ্ধ উচ্চারণ – বাচনিক শিল্প হিসাবে আবৃত্তিকারকে এই শুদ্ধতা রক্ষা করে চলতে হয়। মান্য করতে হয় প্রমিত ভাষা এবং প্রমিত উচ্চারণ।

বাক্ শিল্পাচার্য অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস বাংলা প্রমিত উচ্চারণের অন্তরায় শীর্ষক বক্রৃতায় বলেছেন, বাংলা লিখিতরূপের সংগে বহুক্ষেত্রে তার উচ্চারিত রূপ মেলে না। দুই, বাংলা ভাষায় বর্ণ আছে একাধীক কিন্তু তার ধ্বনি প্রতীক এক। আবার বর্ণ আছে একটি কিন্তু তার ধ্বনি একাধিক। তিন, আমাদের উচ্চারণে প্রায়শ মহাপ্রাণ বর্ণগুলো অল্পপ্রাণ হয়ে যায়। চার, আমাদের আঞ্চলিকতার সমস্যা। এবং পাঁচ, বাংলাভাষার প্রতি আমাদের দরদের অভাব, আন্তরিকতার অভাব- অবহেলা, অযত্ন।

মাতৃভাষাকে উপযুক্ত সম্মান দিতে, ভাষার সৌন্দর্যকে, আভিজাত্যকে ধারন করে, ব্যক্তিত্ব বিকাশে সব সময় সর্বক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা চর্চায় মনোনিবেশ করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বও বটে।


কর্মশালা :
আবৃত্তি শিল্পের চর্চ্চা ও বিকাশের লক্ষ্যে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে আবৃত্তি মনষ্কতা বৃদ্ধিতে এবং শুদ্ধভাবে কবিতা আবৃত্তিতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। আবৃত্তি বিজ্ঞানের যথাযথ অনুশীলন, সঠিক স্বতন্ত্র পাঠ্যক্রমের সাহায্যে শিক্ষা গ্রহণের মধ্যে দিয়ে আবৃত্তির খুঁটিনাটি বিষয়াবলী জেনে নিজেকে প্রস্তুত করা যায় একজন বোদ্ধা আবৃত্তিকার হিসাবে।

আবৃত্তির ইতিহাস, ক্রমবিকাশ, বাকযন্ত্রের ব্যবহার, প্রমিত উচ্চারণ, উচ্চারণ সূত্র, কন্ঠস্বর সাধনা, রস ও ভাব, ছন্দ, স্বরপ্রক্ষেপণ, চিত্রকল্প, আবৃত্তি নির্মাণ কৌশল, সৃজনশীলতা, শিল্পীর বোধ, মঞ্চে আবৃত্তি পরিবেশনা ইত্যাদির পর্যায়ক্রমিক প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে এ শিল্পকে আয়ত্ব করা যায়, সে কারনেই প্রয়োজন আবৃত্তি কর্মশালার। এই বাচিক শিল্পের উৎকর্ষ সাধনে আর কি কোন সহজ সরল পথ আছে? যদিও বলা হয় আবৃত্তি গুরুমুখী বিদ্যা। গুরু না হয় কবিতার আবেগ, চিত্রকল্প কিংবা সার্বিক বিষয় বাতলে দিলেন কিন্তু প্রশিক্ষণ এবং অনবরত অনুশীলনই কেবল নিজেকে নির্মাণ করতে পারে

‘কবিতা প্রকাশের মধ্যে কবি যা করতে চান আবৃত্তিশিল্পীকে সেই দায়িত্ব যেহেতু পালন করতে হয় সেই জন্য তাকে অনেক বেশি সতর্কও থাকতে হয়। তার উপরে দায়িত্বটা অনেক কঠিন এই কারণে যে, মুদ্রিত কবিতা পাঠক একবার পড়ে না বুঝলে তা দশবার পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু আবৃত্তিকারকে মাত্র একবার আবৃত্তি করে সেই কাজটি-অর্থ প্রতিষ্ঠা, সৌন্দর্যের উপলব্ধি এবং তত্ত্ববোধ সৃষ্টি-করতে হবে। তবে কবির চেয়ে আবৃত্তিকারের হাতে যে সম্পদ রয়েছে যেমন, কণ্ঠস্বর, বাচনভঙ্গি, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি, তা কবির নেই।’ সেজন্যই প্রশিক্ষণ ব্যতিত নিজেকে আবৃত্তিকার হিসাবে নির্মাণ প্রায় অসম্ভব।

সারা বছর জুড়েই ঢাকাতে আবৃত্তি কর্মশালার আয়োজন করছে আবৃত্তি সংগঠন গুলো। পিছিয়ে নেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলা শহরগুলো। অনেকটা যার যার মতো করে, আবৃত্তি, প্রমিত উচ্চারণ সাথে লেজুড় যুক্ত হয় সংবাদপাঠ কখনো উপস্থাপনা কিংবা আরো নানাবিধ বিষয় যা আবৃত্তির সাথে সাযুস্যপূর্ণ বটে, তবে না থাকাটা অবশ্যই শ্রেয়। খানিকটা জগাখিচুড়ি-নেই কোন যথাপোযুক্ত শুদ্ধ স্বীকৃত পাঠক্রম।

আবৃত্তি কর্মশালার জন্য একটি স্বীকৃত সার্বজনীন পাঠক্রম যেমন জরুরী তেমনি ভাবে আবৃত্তি উপস্থাপনা, প্রযোজনা এবং সংগঠকদের জন্যও আলাদা কর্মশালা এখন সময়ের দাবী। আর একটি বিষয় নিয়েও আবৃত্তি সংগঠকদের ভাববার প্রয়োজন, নবীনদের জন্য এক প্রকার আবৃত্তি শিক্ষা পাঠ্যক্রম আর যারা আবৃত্তি চর্চায় দীর্ঘদিন নিয়মিত তাদের জন্য আবৃত্তির উৎকর্ষ শীর্ষক উচ্চতর কর্মশালা প্রয়োজন।

অনুশীলন :
অনবরত অনুশীলন নবীন আবৃত্তিকারের জন্য খুব জরুরী। প্রতিদিনের অনুশীলনে প্রয়োজন নানান রসের, আবেগের কবিতার চর্চা করা যার মাধ্যমে কন্ঠের অনায়াসসাধ্য যাতায়াতের পথ প্রশস্ত হয়, কন্ঠ নানা স্তরে অনায়াসে নানা আবেগের রস উৎপাদনে সঠিক মাত্রায় কাজ করে। নিত্যদিনের অনুশীলন, নিয়মিত সারগাম কন্ঠকে নতুন মাত্রা দেয়, নানা স্তরে অনায়াসে বিচরণ করতে সহায়তা করে, কন্ঠকে পরিশীলিত, পরিপক্ক করে নমনীয় করে যা কন্ঠকে কবিতার নানান আবেগ, মেজাজ, রসের আবহের সাথে সঠিক ভাবে সাযুস্যপূর্ণ করে তোলে। কবিতার গূঢ় আবেগের তারতম্য শ্রোতার মনে যথার্থ অর্থবহ হয়ে প্রস্ফুটিত হয়।

কেউ বলেন কবিতাটি ১০০ বার পড়তে হবে মন দিয়ে। পুনঃ পুনঃ পঠন কবিতার গভীরে পৌঁছে দিয়ে আবৃত্তি নির্মাণে নতুন উপলদ্ধিতে সহায়তা করে। স্বরের বিচিত্র আওয়াজ, নিত্যদিনের চর্চা কখনো কখনো প্রতিবেশীর হাস্যরসের কারণ হয়ে উঠতে পারে, পাছে লোকে কিছু বলে বলেই অনুশীলনের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে- তাতে লাভ অনুশীলনকারীরই।


মহড়ার মাধ্যমে শুধু স্বর নয়, আবৃত্তিকার মঞ্চের প্রতিটি আচরণ নির্বাচন করেন। অনর্গল অভ্যাসের ফলে তার সব ধরনের ক্রিয়াকান্ড, যান্ত্রিক অভ্যস্থতায় পৌঁছে যায়। তার দেহযন্ত্র, স্বরপ্রক্ষেপণ, অভিব্যক্তি যখন প্রায় স্বতঃপ্রবৃত হয়ে, একই ছন্দে কাজ করে, এমন কি আবেগের প্রকাশটিও হয় পূর্ব নির্ধারিত। ফলে কোন অবস্থাতেই আবৃত্তিকার বেসামাল হয়ে পড়েন না।


শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ঠোঁটের, জিহ্বার আড়ষ্ঠতা কাটানোর ব্যায়াম, সারগাম, আবৃত্তির চর্চা, নিয়মিত অনুশীলন এসবের মাধ্যমে একজন আবৃত্তিকারের ভেতরে গড়ে ওঠে বিশ্বাসের দৃঢ়তা, শৈল্পিক যথাযথ উপস্থাপন। সুষ্ঠ অনুশীলনে যে যতটা নিষ্ঠাবান ও মেধাবী সে ততটা আবৃত্তি ক্ষেত্রেও উজ্জ্বল।

[আগামী পর্বে পড়ুন ‘আবৃত্তির কথা এবং আবৃত্তি’ এর তৃতীয় ও শেষ অংশ ]

লেখক: আবৃত্তিকার।
e-mail: nazmulnewage@gmail.com

জেএইচ/এসআইএইচ/বিআই/১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
Nazmul AhsanWriter: Nazmul Ahsan (7 Posts)